অষ্টগ্রাম,কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
চরম অবহেলিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে নিদারুণ সংকটজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় হাওরের জনগোষ্ঠীকে। কখনো কখনো তা এত
মর্মস্পর্শী হয় যে হার মানায় সকল বেদনাকে।
তেমনি আজ (২৬জুন) অষ্টগ্রামের এক গর্ভবতী মাকে নিয়ে বাজিতপুর জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল একটি নৌকা। নৌকায় যাত্রী ছিলেন প্রায় ২০-৩০ জন। মাঝপথেই সে মায়ের প্রসব বেদনা তীব্র আকার ধারণ করে। নৌকায় ছিল না কোনো পর্দার ব্যবস্থা, ছিল না কোনো ন্যূনতম চিকিৎসা সরঞ্জাম। এক সহৃদয় যাত্রীর তাৎক্ষণিক উদ্যোগে এবং মাঝির সহযোগিতায় বৃষ্টির জন্য রাখা পলিথিন দিয়ে কোনরকম একটু আড়ালের ব্যবস্থা করে সেখানেই প্রসবের ব্যবস্থা করলে উত্তাল হাওরের বুকে জন্ম নেয় একটি ফুটফুটে শিশু।
কিন্তু শিশুটি পৃথিবীর আলো দেখলেও এই নিষ্ঠুর দুনিয়া তাকে স্বাগত জানাতে পারল না। প্রসবের পর প্রায় ১৫-২০ মিনিট শিশুটি বেঁচে ছিল, নাভি কাটার মতো কোনো জীবাণুমুক্ত সরঞ্জাম বা ন্যূনতম চিকিৎসা জ্ঞান কারও না থাকায় শিশুটির নাড়ি কাটা সম্ভব হয়নি। একজন সহযাত্রীর কোলেই ছটফট করতে করতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে সেই নিষ্পাপ শিশুটি। নৌকার প্রতিটি যাত্রীর চোখ তখন অশ্রুসিক্ত।
নৌকা ঘাটে ভিড়ানোর সাথে সাথে নিজের অসুস্থ মা এবং আসবাবপত্র নৌকায় ফেলে রেখে, সেই সদ্যজাতের মরদেহ ও অসুস্থ মাকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়ে যান সেই সহৃদয় যাত্রী। কিন্তু চিকিৎসকদের অসহায় মন্তব্য ছিল “যদি আর একটু আগে আনা যেত, তবে অক্সিজেন দিয়ে বাচ্চাটাকে হয়তো বাঁচানো যেত।”
এই একটি বাক্যই যেন চাবুকের মতো আঘাত করে আমাদের পুরো স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার গালে। প্রশ্ন জাগে, এই ‘একটু আগে’ আসার দূরত্বটুকু ঘুচাবে কে? যেখানে একটি শিশুর বেঁচে থাকার জন্য সামান্য অক্সিজেনের অধিকারটুকুও সুদূরপরাহত।
অবশেষে সেই সন্তানহারা মাকে এক বুক সান্ত¡না দিয়ে অষ্টগ্রামের নৌকায় তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই মায়ের মনের ভেতরের শূন্যতা আর কলিজা ছেঁড়া আর্তনাদ কি কখনো মুছে যাবে? হাওরের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল নৌকার যাত্রীদের অশ্রুসিক্ত চোখের কান্না আর বোবা হাহাকারে।
শামসুল আলম নামে এক যাত্রী আক্ষেপ করে বলেন, ভাটি এলাকায় একাধিক জনপ্রতিনিধি রয়েছেন। নির্বাচনের আগে অবহেলিত মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের কত শত প্রতিশ্রুতি বাতাসে ওড়ে। অথচ হাওরের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কোন উন্নতি হয়নি। স্বাধীনতার এত বছর পরও হাওরের মানুষের স্বপ্ন আকাশচুম্বী নয়; তারা বিলাসী জীবন চায় না, তারা চায় শুধু একটু সুষ্ঠুভাবে বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার।
অষ্টগ্রামসহ পুরো ভাটি এলাকার মানুষের আজ একটাই জোরালো দাবি অনতিবিলম্বে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেগুলোতে জরুরি সিজারিয়ান সেকশন (গর্ভকালীন অস্ত্রোপচার), পর্যাপ্ত অক্সিজেন এবং হাওরাঞ্চলে দ্রুত রোগী পরিবহনের জন্য ‘ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স’-এর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।
এবিষয়ে কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. নাজমুল করিম মুঠোফোনে এ প্রতিনিধিকে জানান, অষ্টগ্রামে অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার রয়েছে। ইতিপূর্বে একটি সিজারও করা হয়েছে। পরবর্তীতে সার্জন বদলী হয়ে গেলে এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। আমরা এমপি মহোদয়ের সাথে কথা বলে হাওরের তিন উপজেলার (অষ্টগ্রাম-ইটনা-মিঠামইন) মানুষের কথা বিবেচনায় রেখে শীঘ্রই একটি অপারেশন থিয়েটার চালু করার ব্যবস্থা করবো। এর আগে হাওরবাসীর সুবিধার্থে একটি ‘ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স’ চালু করা যায় কি না? এ প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন, ‘ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স’ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এর খরচ রোগীর পক্ষে বহন করাও কঠিন। আমাদের কাছে এটি পরিচালনার কোন বাজেট নেই। তবে এই প্রস্তাবটি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরবেন বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ নয়, এটি আমাদের পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এক জীবন্ত ব্যর্থতার দলিল। আর কোন মায়ের কোল যেন এভাবে হাওরের বুকে খালি না হয়। এই অবহেলার অবসান হোক, নিশ্চিত হোক প্রান্তিক মানুষের বাঁচার অধিকার। হাওরের পানি শুধু সৌন্দর্য ছড়াক, সেখানে যেন আর কোনো নিষ্পাপ শিশুর রক্তের দাগ আর মায়ের চোখের জল না মেশে।


