মোঃ মাসুম বিল্লাহ্ বরগুনা:
বরগুনার পাথরঘাটার বাড়ানি খাল দিয়ে নদী ও সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলে এবং কাঠ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে চরদুয়ানী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এ অভিযোগ প্রচলিত থাকলেও সম্প্রতি সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে অভিযোগের পক্ষে ভিডিওচিত্র ও একাধিক কল রেকর্ড সামনে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীসংযুক্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ বাড়ানি খালটি পাথরঘাটা উপজেলার একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এই পথ ব্যবহার করে প্রতিদিন শত শত মাছ ধরার ট্রলার, স্টিল বডি ট্রলার, কাঠবোঝাই নৌযানসহ বিভিন্ন জলযান চলাচল করে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এই নৌপথ ব্যবহার করতে গেলে ট্রলার ও নৌযানভেদে নিয়মিত নির্ধারিত অঙ্কের টাকা দিতে হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, পাথরঘাটা উপজেলার প্রায় ৪০ হাজার জেলে এই নৌপথ ব্যবহার করে বিষখালী, বলেশ্বর নদী ও বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যান। উপজেলার দুটি মৎস্য বন্দরের একটি চরদুয়ানীতে এবং বাড়ানি খালের শেষ প্রান্তেই রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র। ফলে মাছ শিকার কিংবা মাছ বিক্রি—উভয় ক্ষেত্রেই অধিকাংশ জেলেকে এই খাল ব্যবহার করতে হয়।
জেলেদের অভিযোগ, ছোট কাঠের নৌকা ও স্টিল বডি ট্রলার থেকে মাসে দেড় হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা, মাছ ধরার ট্রলার থেকে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা এবং বড় নৌযান থেকে দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। নির্ধারিত টাকা না দিলে মামলা, হয়রানি, নৌযান আটকে দেওয়া কিংবা বৈধ জালকে অবৈধ দেখিয়ে জব্দ বা পুড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয় বলেও অভিযোগ তাঁদের।
কাঠ ব্যবসায়ী আজাদ ও সোহেল বলেন, বিভিন্ন এলাকা থেকে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে তাঁরা নদীপথে খুলনা, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যান। প্রায় প্রতিটি যাত্রায় তাঁদের দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। তাঁদের দাবি, এ ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জেলে একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, বছরের পর বছর ধরে এ অনিয়ম চলে আসছে। অনেকেই ভয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত এএসআই কবিরের সঙ্গে চরদুয়ানী নৌ-পুলিশ ফাঁড়িতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে ফোন কেটে দেন। পরবর্তী সময়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চরদুয়ানী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. গজনবী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জেলেদের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়ার কোনো বিষয় তাঁর জানা নেই। সাংবাদিকদের দেখানো ভিডিওচিত্র ও কল রেকর্ডে তাঁর ফাঁড়ির সদস্যদের নাম উঠে আসার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে গেলে সাংবাদিকদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন আসাদুল নামে এক পুলিশ সদস্য—এমন অভিযোগও করেছেন অনুসন্ধানকারী সাংবাদিকরা।
পাথরঘাটা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা হাসিবুল হক বলেন, জেলেদের কাছ থেকে নৌ-পুলিশের টাকা নেওয়ার অভিযোগ তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে শুনে আসছেন। তবে এত দিন তাঁদের হাতে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছিল না। সাংবাদিকদের দেখানো ভিডিও দেখে বিষয়টি উপজেলা সমন্বয় সভায় উত্থাপন করবেন বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে অভিযোগের তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন।
বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, জেলেদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। তাঁর দাবি, টাকা না দিলে অনেক সময় জেলেদের মাছ ধরতে যেতে বাধা দেওয়া হয় এবং বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়। তিনি অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এ বিষয়ে বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জিয়া উদ্দিন বলেন, “জেলেদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “নদী বা সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার সময় কোনো জেলে, ট্রলার মালিক বা নৌযান পরিচালনাকারী ব্যক্তি যেন কোনো প্রশাসনিক সংস্থা বা নৌ-পুলিশের কাউকে অবৈধভাবে টাকা না দেন। কেউ চাঁদা দাবি করলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করুন। আমরা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করব এবং অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


