সিরাজুল ইসলাম: জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার//
মিয়ানমারের রাখাইনে যুদ্ধ, নির্যাতন ও অস্থিরতার কারণে আবারও দলে দলে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত সোয়া লাখ নতুন রোহিঙ্গা কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে। এ নিয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়াল প্রায় ১৩ লাখ ২৪ হাজার। সীমান্তের ওপারেও আরও অন্তত ২৫–৩০ হাজার রোহিঙ্গা নাফ নদ অতিক্রমের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানা গেছে।

রোহিঙ্গা তরুণী উম্মে সলিমা (১৮) তাঁদেরই একজন। কয়েক মাস আগে মংডুর আশিকখ্যাপাড়া থেকে মা–ভাইবোনসহ বাংলাদেশে আসেন তিনি। রাখাইনে আরাকান আর্মির হাতে নিহত হন তাঁর বাবা। সলিমা জানান, ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে আসতে গিয়ে ভাইবোনদের হারিয়ে ফেলেছিলেন। পরে তারা মিয়ানমারের ভেতরে এক আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নেয়। এখন আবার দালাল ধরার মতো অর্থের অভাবে তারা সীমান্ত পাড়ি দিতে পারছে না। চোখের জলে সলিমা বলেন, “জুলুমে বাপরে মারি ফেইলে। দুই ভাইবোনের জন্য খুব চিন্তা করছি।”
রোহিঙ্গাদের লাগাতার অনুপ্রবেশে কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরগুলো ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। খুনোখুনি, অস্ত্র বেচাকেনা, মাদক ও মানবপাচারসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে ক্যাম্পের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শুধু চলতি বছরের আট মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিভিন্ন অপরাধে ২৫০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে খুন ১৮টি, মাদক ১৫০টি, অপহরণ ৫০টি এবং ধর্ষণ মামলা ১২টি। গত আট বছরে ক্যাম্পে অন্তত ৩০০ জন খুন হয়েছে বলে জানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তাও কমছে দ্রুত। জাতিসংঘের তথ্যমতে, চলতি বছর শিক্ষা খাতে প্রয়োজন ছিল ৭২ মিলিয়ন ডলার; এর বিপরীতে পাওয়া গেছে মাত্র ১০ মিলিয়নেরও কম। প্রায় ছয় হাজার ৪০০ অনানুষ্ঠানিক স্কুলে পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে বা সময় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে অন্তত চার লাখ রোহিঙ্গা শিশুর শিক্ষাজীবন হুমকির মুখে। সামগ্রিকভাবে ২০২৪ সালে রোহিঙ্গাদের জন্য চাওয়া ৯০০ মিলিয়ন ডলারের বিপরীতে মিলেছে মাত্র ৬০০ মিলিয়ন।
২০১৭ সালের ভয়াবহ ঢলের পর থেকে বাংলাদেশে প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয়। এখন পর্যন্ত একজনকেও ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। চীনের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালে একটি ‘পাইলট প্রত্যাবাসন প্রকল্প’ শুরু হলেও তা অচল হয়ে পড়ে। কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরীর ভাষায়, “আট বছরে একজন রোহিঙ্গাও ফেরত যায়নি, বরং প্রতিনিয়ত নতুন অনুপ্রবেশ ঘটছে। এতে স্থানীয় জনজীবন ও পরিবেশ মারাত্মক চাপে পড়ছে।”
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, মংডু ও আশপাশে জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘর্ষ বেড়ে গেছে। নৌবাহিনীও এতে যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি কার্যত যুদ্ধাবস্থার মতো। এ কারণে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। একই সঙ্গে বিজিবির প্রতিবেদন বলছে, সীমান্তে সক্রিয় একটি শক্তিশালী দালালচক্র অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করাচ্ছে।
জাতিসংঘ চলতি সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে রোহিঙ্গা বিষয়ক বৈশ্বিক সম্মেলন আয়োজন করছে। এর আগে কক্সবাজারে তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক বৈঠক শুরু হয়েছে, যেখানে রোহিঙ্গাদের মানবিক সংকট, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এবং বাজেট ঘাটতির বিষয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে।
রোহিঙ্গা সমাজের নেতা জোবায়ের বলেন, “আমরা দেশে ফিরতে চাই; কিন্তু কবে ফিরব সেটা কেউ জানে না। রাখাইনে যুদ্ধের আগুন জ্বলছে, মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ফেরত যাওয়ার কোনো পথ খোলা নেই।”
বাংলাদেশ সরকারের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, আন্তর্জাতিক সহায়তা ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে, স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে এবং ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা ভয়াবহ চাপে রয়েছে। প্রত্যাবাসনের পথরেখা দৃশ্যমান না হলে এ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠবে, যা শুধু বাংলাদেশ নয়—পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্যই বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।


