আকিবুজ্জামিন :
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। এর মধ্যে ডিপ্রেশন, উদ্বেগ, সিজোফ্রেনিয়া, বায়পোলার ডিসঅর্ডারসহ বিভিন্ন ধরনের মানসিক অসুস্থতা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, করোনাভাইরাস মহামারি, অর্থনৈতিক চাপ, বেকারত্ব, সামাজিক অস্থিরতা এবং যুদ্ধের মতো বৈশ্বিক সংকটগুলো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেও মানসিক সমস্যার প্রবণতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা উপেক্ষা করলে তা ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা, পরিবার ও সমাজের সমর্থন এবং সচেতনতা বৃদ্ধিই এই সমস্যার সমাধানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
মঙ্গলবার (২ সেপ্টেম্বর) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
সংস্থাটি জানায়, বিশ্বে প্রতি ১০০ মৃত্যুর মধ্যে একটি হলো আত্মহত্যাজনিত, যা মূলত তরুণদের মধ্যে বেড়ে চলা মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের ভয়াবহ চিত্রকে তুলে ধরছে।
অনেক দেশ তাদের মানসিক স্বাস্থ্য নীতি এবং কর্মসূচিগুলোকে শক্তিশালী করেছে, তবুও মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং প্রচারের জন্য পরিসেবাগুলো বৃদ্ধির জন্য বিশ্বব্যাপী আরও বেশি বিনিয়োগ এবং পদক্ষেপের প্রয়োজন।
ডব্লিউএইচওর তথ্যমতে, ২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭ লাখ ২৭ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেছে। সংস্থার অ-সংক্রামক রোগ ও মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের ভারপ্রাপ্ত প্রধান ডেভোরা কেস্টেল বলেন, বিশ্বব্যাপী প্রতিটি আত্মহত্যার বিপরীতে ২০টি আত্মহত্যার চেষ্টা ঘটে। এসব মৃত্যু শুধু জীবনকে শেষ করে না, অসংখ্য পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মীকে অমানবিক কষ্টের মুখেও ফেলে।
আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি নারীদের
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২১ সালে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী নারীদের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ ছিল আত্মহত্যা, আর একই বয়সী পুরুষদের মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ।
২০০০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বয়স-সমন্বিত আত্মহত্যার হার বিশ্বব্যাপী ৩৫ শতাংশ কমলেও নির্ধারিত লক্ষ্য থেকে এখনো পিছিয়ে রয়েছে বিশ্ব। ২০১৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে আত্মহত্যার হার এক-তৃতীয়াংশ কমানোর যে লক্ষ্য ছিল, তা বর্তমান প্রবণতায় মাত্র ১২ শতাংশ কমানো সম্ভব হবে।
অঞ্চলভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে ২০০০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আত্মহত্যার হার বেড়েছে ১৭ শতাংশ। অন্য সব অঞ্চলে কিছুটা কমলেও প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আত্মহত্যা ঘটছে নিম্ন-আয়ের দেশগুলোতে, যেখানে বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ বসবাস করে।
উদ্বেগ-হতাশা বাড়ছে
ডব্লিউএইচও সতর্ক করে জানিয়েছে, আত্মহত্যার হার ধীরে ধীরে কমলেও মানসিক ব্যাধি, বিশেষ করে উদ্বেগ ও হতাশার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। ২০১১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বিশ্ব জনসংখ্যার বৃদ্ধির চেয়েও দ্রুত বেড়েছে। বর্তমানে ১০০ কোটির বেশি মানুষ এসব ব্যাধিতে আক্রান্ত।
সংস্থাটি বলছে, তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট আরও গভীর হচ্ছে। এ বৃদ্ধির পেছনে প্রধান দুটি কারণ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং কোভিড-১৯ মহামারি উল্লেখ করেছেন ডব্লিউএইচওর মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান মার্ক ভ্যান ওমেরেন।
সংস্থাটি উদ্বেগ জানিয়ে বলছে, বিশ্বব্যাপী মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। ২০১৭ সালের পর থেকে স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র দুই শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যে ব্যয় হচ্ছে, যা পরিবর্তন হয়নি। হতাশায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ চিকিৎসা পায়।
ডব্লিউএইচও মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গ্যাব্রিয়েসুস বলেছেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পরিবর্তন করা এখন বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।
👉 বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, মানসিক স্বাস্থ্যকে শারীরিক স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।


