কাশেম হাওলাদার, বরগুনা:
“ছোট মেয়েটা অনেকদিন ধরে ইলিশ মাছ খেতে চাইছে। প্রতিদিন সকাল-বিকেল বাজারে যাই, ঘুরে ফিরে দেখি, কিন্তু ইলিশের দাম দেখে খালি হাতে ফিরতে হয়। যে দামে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে, তা দিয়ে আমাদের একদিনের খাবারই হয় না। বড় ইলিশ না হোক, ছোট একটা জাটকা হলেও মেয়েটাকে খাওয়াতে চাই, কিন্তু সেটার দামও আমাদের সামর্থ্যের বাইরে। যে আয় করি, তার সবটা দিয়েও ইলিশ কিনলে চাল কিনতে পারব না।” এমন আক্ষেপ করে কথাগুলো বললেন বরগুনা সদর উপজেলার বদরখালী গ্রামের দিনমজুর লিটন দাস।
চলতি ইলিশের মৌসুমেও বরগুনার বিভিন্ন হাট-বাজারে পর্যাপ্ত ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। বাজারে যে অল্প কিছু ইলিশ মিলছে, সেগুলোর দাম আকাশচুম্বী। ফলে বহু মানুষের জন্য এখন ইলিশ ভাজার তেলে গরম ভাত মেখে খাওয়াটাও স্বপ্নের মতো হয়ে গেছে।
বরগুনা সদরের মাছ বাজারে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বাজারে ইলিশের পরিমাণ খুবই কম। দুই-তিনজন বিক্রেতা ডালায় কয়েকটি মাছ নিয়ে বসে আছেন। তবে বাজারে সাগরের ইলিশ নেই। যেসব ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো পায়রা ও বিষখালী নদীর।
বিক্রেতা মো. রড কামাল বলেন, ১ কেজি ২০০-৩০০ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২,৫০০-২,৬০০ টাকা কেজি দরে। ১ কেজি ১০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ২,৩০০ টাকা, ১ কেজির ইলিশ ২,২০০ টাকা, ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ২,০০০ টাকা এবং ৮০০ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১,৮০০ টাকায়। অন্যদিকে, ৪টি মিলে এক কেজি ওজনের জাটকা ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১,০০০ থেকে ১,১০০ টাকায়।
এদিকে ভরা মৌসুমেও বরগুনার পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না মেলায় হতাশ হয়ে পড়েছেন জেলেরা। পর্যাপ্ত মাছ না পেয়ে অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।
বামনা উপজেলার বিষখালী নদীর জেলে বরুণ দাস বলেন, “এ বছর একজন মহাজনের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা দাদন নিয়েছি। নদীতে জাল ফেললেও দু-একটা মাছ ছাড়া কিছুই পাচ্ছি না। যা পাই, তা দিয়ে দাদনের টাকা শোধ করেই শেষ। সংসার চালাতে এনজিও থেকে নতুন করে ঋণ নিতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভিটেমাটি বিক্রি করে দেনা শোধ করতে হবে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভরা মৌসুমেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ার কারণ মূলত সাগর মোহনায় শিল্পায়ন, নদীর প্রবেশপথ ভরাট হয়ে যাওয়া এবং নদীর মোহনায় অসংখ্য ট্রলারের জাল পাতার ফলে বঙ্গোপসাগর থেকে মা ইলিশ নদীতে উঠতে পারছে না। ফলে ইলিশ অন্যত্র সরে যাচ্ছে।
এছাড়া নদী ও মোহনায় নির্বিচারে জাটকা নিধন করে ‘চাপিলা’ নামে বাজারে বিক্রি করায় নদীর ইলিশ ক্রমশ কমে যাচ্ছে।
জেলেরা অভিযোগ করেন, নদীর ইলিশের প্রবেশপথ এবং সাগর মোহনার ডুবোচরে অসাধু জেলেরা অবৈধ ‘বেহুন্দি’, ‘চরঘেরা’, ‘পিটানো’, ‘খরছি’, ‘জাম খরছি’ জাল ব্যবহার করছেন। এসব জাল অনেকটা বেড়ার মতো কাজ করে। পাথরঘাটা উপজেলার সাগরগামী জেলে মকবুল মাঝি বলেন, “সাগর মোহনার যেসব চ্যানেল বা লোঙ্গা দিয়ে ইলিশ নদীতে ওঠে, সেসব স্থানে প্রভাবশালী জেলেরা জাম খরছি জাল পেতে রাখেন। এসব জালে ইলিশ আটকে গিয়ে আবার সাগরে ফিরে যায়। আর যেখানে এসব জাল পাতা হয়, সেখানে কিছুদিনের মধ্যেই চর পড়ে।”
এ বিষয়ে বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, “ইলিশ সংকটের জন্য প্রধানত দায়ী অবাধে জাটকা শিকার। বাজারে চাপিলা নামে যে মাছ বিক্রি হয়, সেটা আসলে ছোট ইলিশ। সরকার এবং মৎস্য বিভাগ জাটকা নিধন প্রতিরোধে কাজ করলেও এই ‘চাপিলা’ নামে বিক্রি হওয়া লাখ লাখ টন ইলিশের বাচ্চার দিকে কোনো নজর নেই। বরগুনার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন টনকে টন চাপিলা বিক্রি হয়। চাপিলা বাঁচাতে না পারলে নদীর ইলিশও আর টিকবে না।”
বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মহসীন বলেন, “সমুদ্রে ইলিশ আছে, তবে জেলেরা কম পাচ্ছেন। কম বৃষ্টির কারণে নদীর পানির তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। এখন বৃষ্টি বাড়ায় তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে আসছে। আশা করা যায়, সামনে উপকূলীয় নদ-নদীতে ইলিশ ধরা পড়বে।”


