এম কে হাসান, জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
আজ ২০ জুন, বিশ্ব শরণার্থী দিবস। সারা বিশ্ব যখন শরণার্থীদের প্রতি সহানুভূতি ও সংহতির বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতায় ব্যস্ত, ঠিক তখনই বাংলাদেশের কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে আছে এক চরম অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কার কালো মেঘে। দীর্ঘ প্রায় নয় বছর ধরে রোহিঙ্গা সংকটের যে মানবিক মুখ আমরা দেখে আসছি, আজ তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে এক ভয়াবহ ‘অস্তিত্ব রক্ষার সংকট’। এটি কেবল একটি সীমান্ত বা শরণার্থী ইস্যু নয়, এটি এখন আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক মহাবিপদ সংকেত।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে গা শিউরে ওঠে। উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার মোট আয়তন মাত্র ৬৫০.৪৮ বর্গকিলোমিটার। ২০২২ সালের সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, এই দুই উপজেলার স্থানীয় জনসংখ্যা ৫ লক্ষ ৯৭ হাজার। অথচ জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (UNHCR) তথ্যানুযায়ী, সেখানে বর্তমানে ১১ লক্ষ ৬৩ হাজার ৬১৯ জন রোহিঙ্গা অবস্থান করছে (যার প্রকৃত সংখ্যা ১৫ লক্ষের কাছাকাছি পৌঁছানো বিচিত্র নয়)। মাত্র ৬৫০ বর্গকিলোমিটারের এই ক্ষুদ্র ভূখণ্ডে স্থানীয়দের তুলনায় শরণার্থী সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি! পৃথিবীর ইতিহাসে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে এমন জনমিতিক বিপর্যয় বিরল।
পরিস্থিতি কেবল সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন অনিয়ন্ত্রিত জন্মহারের দিকে মোড় নিয়েছে। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের (আরআরআরসি) ভয়াবহ তথ্য বলছে, ক্যাম্প গুলোতে প্রতিদিন গড়ে ৮৭ থেকে ১০০টি শিশুর জন্ম হচ্ছে। বছরে এই সংখ্যাটি ৩০,০০০ থেকে ৪৮,০০০-এ পৌঁছাচ্ছে। যেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্মহার স্বাভাবিক, সেখানে এই লাগামহীন বৃদ্ধি একটি জনপদকে ভেতর থেকে গ্রাস করে ফেলছে। এই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের নিজেদের ভিটেমাটিতেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়ার ঝুঁকির মুখে রয়েছে। যা ইতিমধ্যে লক্ষনীয় যে, স্থানীয়দের আবাদি চাষের জমি, অনাবদি জমি রোহিঙ্গা শিবিরের কাটা তাঁরের মধ্যে চলে গেছে, যা আর ইচ্ছা করলেও নিজেদের মতো করে ব্যবহার করা যাচ্ছে না বা অনেক ক্ষেত্রে হাত ছাড়া হয়ে গেছে ।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক হলো স্থানীয় জনপদ ও আশ্রিতদের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি। ক্যাম্প গুলো এখন অপরাধের স্বর্গরাজ্য। মাদক চোরাচালান, চুরি, ছিনতাই, অপহরণ ও খুনের মতো ঘটনায় স্থানীয় মানুষ আজ তটস্থ। অপহরণ আতঙ্কে উখিয়া-টেকনাফের মানুষের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। ঘরের দরজায় তালা দিয়েও তারা নিরাপদ নন।
এরই মধ্যে সম্প্রতি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র হাসপাতালে হামলার ঘটনাটি সামাজিক সহনশীলতার সব বাঁধ ভেঙে দিয়েছে। একজন রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ তুলে সংঘবদ্ধ ভাবে রোহিঙ্গারা হাসপাতালে হামলা ও স্থানীয়দের সাথে মারামারির ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং এটি স্থানীয় জনপদের ওপর সরাসরি চ্যালেঞ্জ। যে আশ্রয় দাতার হাতে অন্ন ও চিকিৎসা জুটছে, তাদের ওপরই হামলার এই ঔদ্ধত্য স্থানীয়দের মনে চরম ক্ষোভ ও ভীতির জন্ম দিয়েছে।
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ আজ একটি বারুদের স্তূপের ওপর বসে আছে। একদিকে জনসংখ্যার অতিঘনত্ব, অন্যদিকে অপরাধ প্রবণতা ও সামাজিক অস্থিরতা - এই দুইয়ের সমন্বয়ে যেকোনো মুহূর্তেই এখানে বড় ধরনের জাতীয় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। আমরা কতদিন এই মানবিক দায়ভার স্থানীয়দের ওপর চাপিয়ে রাখা যায় ? স্থানীয়রা আজ নিজেদের ঘর-বাড়ি ও ফসলি জমিতে এক চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিনাতিপাত করছেন।
বিশ্ব শরণার্থী দিবসের এই দিনে আমাদের স্পষ্ট বার্তা - মানবিকতার দোহাই দিয়ে আর কতদিন স্থানীয়দের জীবন ও নিরাপত্তা বিসর্জন দেওয়া হবে? আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কেবল ত্রাণ সহায়তা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করছে, কিন্তু তাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ নেই। সময় ফুরিয়ে আসছে। পাহাড়ের ঢালে জমে ওঠা এই বারুদের স্তূপে একটি ছোট স্ফুলিঙ্গই যথেষ্ট গোটা জনপদকে ধ্বংস করার জন্য।
রাষ্ট্রের কাছে আকুল আবেদন, স্থানীয় জনগণের জানমাল ও অস্তিত্ব রক্ষায় ক্যাম্প গুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করুন এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বকে বাধ্য করুন মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের সম্মান জনক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে। স্থানীয়দের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, আর বিলম্ব হলে এই বিপর্যয়ের দায় ইতিহাস কোনো পক্ষকেই ক্ষমা করবে না।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: সাইফুল ইসলাম|
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ১৮৮, এম জে টাওয়ার (৮ম তলা), ফকিরাপুল (বড় মসজিদের পাশে) মতিঝিল, ঢাকা-১০০০। মোবাইল:- ০১৯১৯৯২০০৫৮, ০১৮১৯৯২০০৫৮, ই মেইল: gomtirbarta@gmail.com