সিরাজুল ইসলাম, জেলা প্রতিনিধি (কক্সবাজার)
কক্সবাজারের উখিয়া। কুতুপালং ও বালুখালী শরণার্থী ক্যাম্পের বাইরে স্থানীয় বাজারগুলোয় একের পর এক গজিয়ে উঠছে রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ফার্মেসি। লাইসেন্সবিহীন এই দোকানগুলো এখন যেন অবাধে চলছে, প্রশাসনের কোনো কার্যকর নজরদারি নেই।
গত ২৭ ও ২৮ আগস্ট সকালে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে—পালংখালী, থ্যাংখালী, বালুখালী, কুতুপালং বাজার থেকে শুরু করে লম্বাশিয়া সড়ক পর্যন্ত অর্ধশতাধিক ফার্মেসি চালাচ্ছে প্রশিক্ষণহীন রোহিঙ্গারা। ওষুধ বিক্রিতে আইন অনুযায়ী যেসব শর্ত বাধ্যতামূলক—প্রেসক্রিপশন, নিবন্ধিত ফার্মাসিস্ট, বৈধ লাইসেন্স—সবকিছুই যেন কেবল কাগজে-কলমে রয়ে গেছে
তথ্য বলছে, স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নাম ভাড়া দিয়ে কিংবা ভুয়া ড্রাগ লাইসেন্স দেখিয়ে এসব ফার্মেসি চালাতে সহযোগিতা করছে। ফলে “নিলিমা ফার্মেসী, এম ফার্মেসী, মেসার্স মনজুর ফার্মেসী”র মতো কিছু দোকানে কাগজে লাইসেন্স থাকলেও কার্যত নিয়ন্ত্রণ রোহিঙ্গাদের হাতে। এমনকি “এস বি মেডিকো” নামের এক দোকান রোহিঙ্গার হলেও লাইসেন্স ব্যবহার হচ্ছে স্থানীয় এক ব্যক্তির নামে
ওষুধ প্রশাসনের আইন অনুযায়ী প্রেসক্রিপশন ছাড়া এন্টিবায়োটিক, ঘুমের ওষুধ বা বিদেশি ব্র্যান্ড বিক্রি নিষিদ্ধ। কিন্তু উখিয়ার এসব দোকানে ক্যাশ মেমো ছাড়া সেসব ওষুধ অবাধে বিক্রি হচ্ছে। শুধু তাই নয়, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রাখার অভিযোগও রয়েছে একাধিক দোকানে।
কুতুপালং কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সভাপতি ইকবাল বলেন, “রোহিঙ্গারা ব্যবসা করছে, তবে তাদের কাউকে সমিতির সদস্য করা হয়নি। অবৈধ দোকানের তালিকা আমাদের কাছে আছে, চাইলে প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে পারে।” সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবছার উদ্দিনের অভিযোগ—“ওষুধ প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও ফল পাওয়া যায় না। কয়েকদিন পর আবারও পুরনো অবস্থায় ফিরে যায়।”
এক স্থানীয় ফার্মেসি মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “ড্রাগ লাইসেন্স পেতে টাকা ছাড়া কাজ হয় না। অনেকেই তাই লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা করছে। আবার প্রশাসনের কেউ এলে হাতে কিছু বুঝিয়ে দিলে আর ঝামেলা থাকে না।”
সুশাসন নাগরিক অধিকার কমিটির এক নেতা বলেন, “ওষুধ প্রশাসনের দুর্নীতি ও অনিয়ম উখিয়ার জনস্বাস্থ্যকে বিপদের মুখে ফেলছে। চাইলে একদিনেই সব অবৈধ দোকান বন্ধ করা সম্ভব, কিন্তু অদৃশ্য কারণে তারা নীরব।”
কক্সবাজার ওষুধ প্রশাসনের তত্ত্বাবধায়ক কাজী মোহাম্মদ ফরহাদ বলেন, “অবৈধ ফার্মেসির বিষয়ে আমরা অবগত। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তবে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি কল কেটে দেন।
অন্যদিকে ১৪ এপিবিএনের অতিরিক্ত ডিআইজি সিরাজ আল আমিন বলেন, “রোহিঙ্গারা নানা অজুহাতে ক্যাম্পের বাইরে আসে, স্থানীয় বাজারেও ঢুকে পড়ে। তবে ক্যাম্পের ভেতরের নিরাপত্তা আমাদের দায়িত্ব। অবৈধ ব্যবসা বন্ধে সিআইসি ও স্থানীয় প্রশাসন উদ্যোগ নিলেই ফল আসবে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রেসক্রিপশন ছাড়া এন্টিবায়োটিক বিক্রি ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বাড়াবে, যা ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করবে। অন্যদিকে বিদেশি ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ব্যবহারে সাধারণ মানুষ অজান্তেই বিপদের মুখে পড়ছে।
উখিয়ার সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—অলিগলিতে গজিয়ে ওঠা এসব ফার্মেসি বন্ধে প্রশাসনের নীরবতা কেন? রোহিঙ্গাদের ব্যবসা-বাণিজ্য যখন আইন বিরোধী, তখন তারা কীভাবে বছরের পর বছর প্রশাসনের চোখের সামনে ডাক্তারি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে?


