এম কে হাসান, জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
পর্যটন রাজধানী কক্সবাজার এবং বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরের অবস্থানকারী বিপুল জন সমষ্টির ওপর এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য বিপর্যয় বা টাইম বোম অপেক্ষা করছে। দেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতি এবং সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, কক্সবাজার জেলায় অবস্থানরত ৪৪ লক্ষাধিক মানুষের মধ্যে প্রায় ৯ থেকে ১০ লক্ষ মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের (Chronic Kidney Disease - CKD) এর কোনো না কোনো পর্যায়ে আক্রান্ত হতে পারে। এই আসন্ন ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং বিপুল সংখ্যক রোগীর জীবন বাঁচাতে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে অবিলম্বে ৪০ শয্যা বিশিষ্ট একটি অত্যাধুনিক পূর্ণাঙ্গ কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার চালু করা কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং এটি এখন একটি অবধারিত জীবন-মরণ প্রশ্ন।
ভয়াবহ পরিসংখ্যান:- গাণিতিক সম্ভাবনা নাকি বাস্তব সতর্কতা?
প্রাপ্ত তথ্য ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কক্সবাজারে বর্তমানে তিনটি প্রধান জনগোষ্ঠীর এক বিশাল সমাবেশ রয়েছে:
১. স্থানীয় অধিবাসী:- প্রায় ২৯ লক্ষ।
২. রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী:- প্রায় ১২ লক্ষ (সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ১১.৮৯ লক্ষ)।
৩. দেশি-বিদেশি উন্নয়ন ও মানবিক কর্মী:- প্রায় ১ লক্ষ।
বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের প্রকোপ ভয়াবহ—গবেষণায় দেখা গেছে, এটি প্রায় ২২.৪৮% পর্যন্ত হতে পারে, যা বৈশ্বিক গড় হারের তুলনায় উদ্বেগ জনক ভাবে বেশি। এই ২২.৪৮% হার যদি কক্সবাজারের সামগ্রিক জন সমষ্টির ওপর প্রয়োগ করা হয়, তবে ৪৫ লক্ষ মানুষের মধ্যে ১০ লক্ষ ১০ হাজার মানুষ কিডনি রোগের শিকার হতে পারে। যদিও এটি একটি গাণিতিক সম্ভাবনা এবং বয়স ও স্বাস্থ্যঝুঁকির তারতম্যের কারণে সংখ্যাটি কিছুটা কম বা বেশি হতে পারে, কিন্তু এটি যে একটি আসন্ন জাতীয় স্বাস্থ্য সংকটের আগাম সতর্কবার্তা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রকৃত সংখ্যা জানার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে মাঠ পর্যায়ে জরুরি জরিপ বা স্ক্রিনিং প্রয়োজন।
ঝুঁকির ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা: - স্থানীয় বনাম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী,
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিডনি রোগের লক্ষণ অনেক সময় দেরিতে প্রকাশ পায়, ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ অজান্তেই এই মরণ ব্যাধি বহন করে চলছেন। কক্সবাজারের ক্ষেত্রে ঝুঁকির কারণ গুলো আরও জটিল।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিস্থিতি:- রোহিঙ্গা ক্যাম্প গুলোর অত্যধিক ঘিঞ্জি পরিবেশ, অস্বাস্থ্যকর জীবন যাপন, বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং চরম মানসিক চাপের কারণে শরণার্থী জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের প্রকোপ স্থানীয়দের তুলনায় অনেক বেশি। আর উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস হলো কিডনি বিকল হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। এই বিপুল শরণার্থী জনসংখ্যা স্থানীয় স্বাস্থ্য কাঠামোর ওপর অপ্রতিরোধ্য চাপ সৃষ্টি করছে।
স্থানীয় ও উন্নয়ন কর্মী:- স্থানীয় জনগণের মধ্যেও সচেতনতার অভাব এবং খাদ্যাভ্যাসের কারণে ঝুঁকি বাড়ছে। এছাড়া, ১ লক্ষ উন্নয়ন কর্মী যারা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
রোগীদের অন্তহীন দুর্ভোগ ও অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ:-
কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল, যা এই বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রধান ভরসা, সেখানে বর্তমানে কিডনি ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা একেবারেই নেই । ফলে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী ও তাদের স্বজনরা এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন।
১. চিকিৎসার খোঁজে যাযাবর জীবন:- জেলা সদর হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিস ব্যবস্থা না থাকায়, রোগীদের বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে অথবা সুদীর্ঘ ১৫৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম শহরে যেতে হয়। একজন মুমূর্ষু কিডনি রোগীর জন্য এই দীর্ঘযাত্রা এবং সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা কেবল শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণাই বাড়ায় না, বরং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও দ্রুত কমিয়ে দেয়, যা মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে।
২. দরিদ্র পরিবারে চরম হাহাকার:- বেসরকারি হাসপাতাল বা চট্টগ্রামে দীর্ঘমেয়াদি ডায়ালাইসিস চিকিৎসার জন্য যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়, তা দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে বহন করা অসম্ভব। অনেক পরিবার চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে বসতভিটা এবং জমিজমা বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে বা দারিদ্র্যের চরম সীমায় পৌঁছেছে ।
৩. সময়ে চিকিৎসা না পাওয়ার ঝুঁকি:- কিডনি রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস একটি জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা। সঠিক সময়ে সঠিক ডায়ালাইসিস না পেলে রোগীর অবস্থা দ্রুত গুরুতর হয়ে যেতে পারে, যা অনিবার্য মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
৪০ শয্যার ডায়ালাইসিস সেন্টার: যৌক্তিকতা ও মানবিক আবশ্যকতা:-
কক্সবাজারবাসীর জীবন বাঁচাতে, চিকিৎসা বৈষম্য দূর করতে এবং একটি আধুনিক ও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো নিশ্চিত করতে জেলা সদর হাসপাতালে ৪০ শয্যা বিশিষ্ট একটি কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন একটি মানবিক ও জরুরি প্রয়োজন। একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুবিধা সম্পন্ন ডায়ালাইসিস সেন্টার চালু হলে নিম্নলিখিত সুফল পাওয়া যাবে:
১. জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করণ:- জটিল ও জরুরি অবস্থায় রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে, যা অসংখ্য প্রাণ বাঁচাতে সাহায্য করবে।
২. দুর্ভোগ ও খরচ হ্রাস:- রোগীদের চট্টগ্রাম বা বেসরকারি হাসপাতালে দৌড়ঝাঁপ কমবে, ফলে তাদের শারীরিক ভোগান্তি এবং বিশাল অর্থনৈতিক চাপ হ্রাস পাবে।
৩. সামাজিক ন্যায়বিচার:- সবার জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। এই সেন্টার স্থাপন কক্সবাজারবাসীর স্বাস্থ্যসেবার অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি মাইল ফলক হবে।
৪. জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ও পর্যটন শিল্পের অগ্রগতি:- একটি অত্যাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা পর্যটক ও স্থানীয় জনগণ উভয়ের মধ্যেই আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলবে, যা পরোক্ষভাবে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে অবদান রাখবে।
স্থানীয় সুশীল সমাজ, চিকিৎসক, সমাজসেবী এবং সর্বোপরি ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ একযোগে এই দাবি উত্থাপন করেছেন। তাদের মতে, কক্সবাজারবাসীর এই ন্যায়সম্মত দাবি দীর্ঘদিনের এবং এটি না পূরণ হওয়ার কারণে অসংখ্য মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে। কক্সবাজার জেলা বিএনপি'র সহ-সভাপতি ও পৌর বিএনপি'র আহ্বায়ক রফিকুল হুদা চৌধুরী বলেন , আমি বুঝি একটা পরিবারে একজন কিডনি রোগী থাকা মানে কি পরিমান কষ্ট এবং কি পরিমান আর্থিক স্বচ্ছলতা দরকার। আমি তিলে তিলে দীর্ঘ দিন ভুগেছি। কিন্তু কাউকে বুঝাতে পারি নাই।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: সাইফুল ইসলাম|
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ১৮৮, এম জে টাওয়ার (৮ম তলা), ফকিরাপুল (বড় মসজিদের পাশে) মতিঝিল, ঢাকা-১০০০। মোবাইল:- ০১৯১৯৯২০০৫৮, ০১৮১৯৯২০০৫৮, ই মেইল: gomtirbarta@gmail.com