
এম কে হাসান, জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার//
*পর্যটন, বাণিজ্য ও মানবিক কার্যক্রমের চাপ বহনে অক্ষম বর্তমান অবকাঠামো*
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক, মানবিক ও পর্যটন কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু কক্সবাজার–চট্টগ্রাম মহাসড়ক বর্তমানে তার সক্ষমতার সীমায় ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিদিন প্রায় ১৫,০০০ থেকে ১৮,০০০ যানবাহন এই রুটে চলাচল করে-যার বেশিরভাগই যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী পরিবহন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান দুই লেনের এই সড়ক এখন আর দেশের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি ও পর্যটন খাতের চাহিদা মেটাতে পারছে না।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও বাস্তব চিত্র:- প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি দক্ষিণাঞ্চলকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের সঙ্গে সংযুক্ত করে। একই সঙ্গে এটি মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, মহেশখালী অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রকল্পের প্রধান প্রবেশপথ হিসেবেও কাজ করছে।
এছাড়া রোহিঙ্গা মানবিক সহায়তার সমস্ত পণ্য এই মহাসড়ক দিয়েই পরিবহন করা হয়, যা এর উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
দুর্ঘটনা ও যানজট: বাড়ছে জনভোগান্তি:- বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যানুসারে, মহাসড়কটিতে প্রতি মাসে গড়ে ৩০০টিরও বেশি দুর্ঘটনা ঘটে । সংকীর্ণ রাস্তা, বিপরীতমুখী যানবাহন এবং পর্যাপ্ত ওভারটেকিং স্পেসের অভাবই এর প্রধান কারণ।
সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা স্থানীয় জনগণের মধ্যে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী মো. রশিদ বলেন, একসময় চট্টগ্রাম যাওয়া যেত তিন ঘণ্টায়, এখন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা লেগে যায়। যানজটে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত খরচ পড়ছে, ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
উন্নয়নের জন্য জরুরি ছয় লেন পরিকল্পনা:- বিশেষজ্ঞদের অভিমত, মহাসড়কটি ৬ লেনে উন্নীত হলে:- ১. দুর্ঘটনার হার অন্তত ৭০ শতাংশ হ্রাস পাবে, ২. ভ্রমণ সময় কমে আসবে প্রায় অর্ধেকে, ৩. পর্যটন ও বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি ঘটবে, ৪. মাতারবাড়ি বন্দর সংযুক্ত শিল্পাঞ্চলে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি বলেন, এই মহাসড়ক দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক শিরা। এটি প্রশস্ত না হলে কক্সবাজারের উন্নয়ন পরিকল্পনাও ধীর হয়ে পড়বে।
সরকারের অবস্থান:- নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। মহাসড়কটি ৬ লেনে উন্নীত করার প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সম্ভাবনা ইতিবাচক। বর্তমানে প্রস্তাবটি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে।
সড়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চলের বাণিজ্যিক প্রবাহ, পর্যটন আয় এবং কর্মসংস্থান—তিন দিকেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ:- অর্থনীতিবিদদের মতে, কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন নগর ও বন্দর নির্ভর অর্থনৈতিক জোন হিসেবে গড়ে তুলতে হলে নিরাপদ, আধুনিক ও দ্রুত গতির সড়ক নেটওয়ার্ক অপরিহার্য। তবে ভূমি অধিগ্রহণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা-এই তিনটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বাস্তবায়নের সময়।
কক্সবাজার–চট্টগ্রাম মহাসড়ক শুধু একটি সড়ক নয়, এটি দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবাহের মূল ধমনী। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এই রাস্তাটি প্রশস্ত না করলে উন্নয়ন থেমে যাবে। তাই উন্নত, নিরাপদ ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ছয় লেনের বাস্তবায়ন এখন শুধু প্রয়োজন নয়, বরং সময়ের দাবি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: সাইফুল ইসলাম|
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ১৮৮, এম জে টাওয়ার (৮ম তলা), ফকিরাপুল (বড় মসজিদের পাশে) মতিঝিল, ঢাকা-১০০০। মোবাইল:- ০১৯১৯৯২০০৫৮, ০১৮১৯৯২০০৫৮, ই মেইল: gomtirbarta@gmail.com