মো: সিপাউর রহমান, কুলাউড়া প্রতিনিধি:
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার তালিকা প্রণয়নে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ দিয়ে তালিকায় প্রবাসী, বিত্তবান ও কৃষিকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন এমন ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বঞ্চিত প্রান্তিক ও বর্গাচাষিরা।
এ ঘটনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছেন মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনের সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম শকু। তিনি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষকের নাম তালিকায় না থাকলেও এমন অনেক ব্যক্তি সহায়তা পেয়েছেন, যাদের কৃষিজমি নেই কিংবা বন্যায় কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তালিকায় প্রবাসী পরিবারের সদস্যদের নামও রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য এবং বিএনপির ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কয়েকজন নেতার যোগসাজশে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা যথাযথ যাচাই-বাছাই না করেই তালিকা চূড়ান্ত করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
গত ২৩ জুন বরমচাল ও ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নে কৃষকদের মধ্যে চাল ও নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়। এসময়ই অনিয়মের বিষয়টি সামনে আসে।
ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নে বঞ্চিত কৃষকরা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আফতাব মিয়া ও ইউপি সদস্য ছয়ফুল ইসলামের বিরুদ্ধে তালিকা প্রণয়নে অনিয়মের অভিযোগ তোলেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা নামগুলো হলো:
দাউদপুর গ্রামের মো. মতিন মিয়া, যার দুই ছেলে ফ্রান্সে এবং এক ছেলে সরকারি চাকরিতে কর্মরত
দক্ষিণ আফ্রিকাপ্রবাসী জলিল মিয়া ও তার ভাই খালিক মিয়া
সাতরা গ্রামের নাদির মিয়া, যার এক ছেলে কানাডায় থাকেন
ইউসুফ তৈয়বুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাসুদ আহমদ এবং জামাল মিয়া, যারা বোরো মৌসুমে কোনো আবাদ করেননি
বরমচাল ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে খালেদ নামে এক ব্যক্তি বোরো জমি না থাকা সত্ত্বেও সহায়তা পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই ওয়ার্ডের ইমাম তরিকুল ইসলাম আকুল, সাবেক ইউপি সদস্য মহরম আলী এবং শাহিন আহমদ নাছির ও তার ভাই সেলিম আহমদও সহায়তা পেয়েছেন, যাদের পরিবারের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছেন।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ছয়ফুল আলম বলেন, “আমাদের ইউনিয়নের কৃষকদের তালিকা তৈরিতে অনেক অনিয়ম হয়েছে। প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে অনেক প্রবাসী ও বিত্তবান পরিবারের সদস্যদের সহায়তা দেওয়া হয়েছে।”
অভিযুক্ত ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আফতাব মিয়া বলেন, “চেয়ারম্যান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাসহ যাচাই-বাছাই কমিটি ৫১৮ জনের চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করেছিল। কিন্তু বরাদ্দ এসেছে মাত্র ১৯০ জনের জন্য। তাড়াহুড়ো করে তালিকা প্রস্তুত করতে গিয়ে কিছু ত্রুটি হয়ে থাকতে পারে।”
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কুলাউড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্য পরিবারপ্রতি ১৫ কেজি চাল ও ৩ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ কর্মসূচির আওতায় উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ১ হাজার ৫৩৭ জন কৃষকের জন্য ৪৬ দশমিক ১ মেট্রিক টন চাল এবং ৯২ লাখ ২২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, “বরাদ্দ কম পাওয়ায় কিছু প্রকৃত কৃষকের নাম বাদ পড়েছে, এটি সত্য। অনিয়মের বিষয়ে ইউএনওর কাছে অভিযোগ দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা আক্তার বলেন, “চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ অনেক কম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনিয়মের অভিযোগ দেখেছি। কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও তালিকাভুক্ত হয়ে থাকলে অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
এ বিষয়ে সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম শকু বলেন, “কুলাউড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনা বিতরণে নানা অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না। জনগণের ভোটে নির্বাচিত এই গণতান্ত্রিক সরকার সবসময় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে থাকবে।”


