মো: সিপাউর রহমান কুলাউড়া (মৌলভীবাজার)সংবাদদাতা:
কুলাউড়ায় উপজেলায় মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের নিচে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে অবৈধভাবে পাইপ স্থাপনের সময় মাটি চাপায় নিহত দিনমজুর বিজয় মালাকার (৪৫) এর পরিবার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ পায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এর আগে ঘটনাটি নিষ্পত্তির জন্য সালিশি বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিহত বিজয়ের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৩০ শতাংশ জমি রেজিস্ট্রি করে দেয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন অভিযুক্ত ব্যক্তি কুরপান আলী। কিন্তু ঘটনার ৬ মাস অতিবাহিত হলেও এখনো ক্ষতিপূরণ বাবদ জমি বা টাকা পায়নি নিহত বিজয়ের পরিবার। এ নিয়ে গত বুধবার (১ জুলাই) বিকেলে উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের রনচাপ এলাকায় নিহত বিজয়ের বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন করে এমন অভিযোগ করেন বিজয়ের স্ত্রী প্রতিভা মালাকার, মা রঞ্জিতা মালাকার, ভাই বিষু মালাকার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তারা বলেন, হাজীপুর ইউনিয়নের রনচাপ গ্রামের মনু নদীর দক্ষিণ পাড়ের বেড়ী বাঁধ সংলগ্ন পাশ^বর্তী চক রনচাপ গ্রামের প্রভাবশালী কুরপান আলীর কৃষি জমি রয়েছে। ওই জমির জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোন অনুমতি না নিয়ে কুরপান আলী ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক ১০টার সময় দিনমজুর বিজয় মালাকারকে জোরপূর্বক তার বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে ঘটনাস্থলে নিয়ে যান। ওই সময় কুরপান আলীর নেতৃত্বে ভেকু চালক রফিক মিয়া ভেকু মেশিন দিয়ে সরকারী টাকায় নির্মিত বাঁধের নিচে প্রায় ২০-২৫ ফুট গভীর গর্ত করেন। ওই সময় বিজয়কে গর্তে পাইপ বসানোর জন্য বললে বিজয় রাজি হননি। কিন্তু প্রভাবশালী কুরপান আলী ভয়ভীতি ও বিজয়ের পাওনা টাকা পরিশোধ না করার হুমকি দিয়ে বিজয়কে দিয়ে পাইপ বসানোর জন্য বলে। পরে বাধ্য হয়ে আনুমানিক রাত ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে গভীর গর্তে নামামাত্রই ২০-২৫ ফুট ওপর থেকে বেড়ী বাঁধের মাটি ধ্বসে পড়লে ঘটনাস্থলে বিজয় মারা যান। পরে স্থানীয় লোকজন এক ঘন্টা চেষ্টা করে মাটির নিচ থেকে বিজয়ের মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নূর আহমদ চৌধুরী বুলবুলকে খবর দেন। পরে তিনি থানা পুলিশকে অবহিত করলে থানার এস আই মুহিত মিয়া পুলিশের একটি টিম নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে নিহতের মরদেহের সুরতহাল তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করেন। ওই দিনই রাতে লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এদিকে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি সমাধানের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তি কুরপান আলী নিহতের বাড়িতে গিয়ে প্রস্তাব দেয়। পরে কুরপান আলী স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নূর আহমদ চৌধুরী বুলবুল, ইউপি সদস্য বিধান দত্তসহ স্থানীয় গণমান্য লোকদের ধারস্ত হন। ওই সময় বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় নিহত বিজয়ের পরিবারের ভরপোষণের জন্য ৬০ শতাংশ জমি রেজিস্ট্রি করে দিতে হবে। কিন্তু কুরপান আলী তা মানতে রাজি হননি। একপর্যায়ে তিনি ঘটনার নিষ্পত্তির জন্য বিজয়ের পরিবারকে ৩০ শতাংশ জমি রেজিস্টি করে দিবেন বলে রাজি হন। কিন্তু রাজি হলেও ঘটনার ছয় মাস অতিবাহিত হলেও নিহত বিজয়ের পরিবারকে প্রতিশ্রুতি দেয়া ওই জমি বুঝিয়ে দিচ্ছেন না। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে নিহত বিজয়ের ছেলে অর্জুন মালাকার গত ২২ জুন মৌলভীবাজার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে কুরপান আলীকে প্রধান আসামী ও ভেকু চালক রফিক মিয়াকে দ্বিতীয় আসামী করে একটি মামলা দায়ের করেন।
নিহত দিনমজুর বিজয়ের স্ত্রী প্রতিভা মালাকার বলেন, ‘আমার স্বামী মাটি চাপায় মারা গেছে। এই শোক আমি কীভাবে সহ্য করব? পরিবারে সহায় সম্পদ বলতে কিছুই নেই। শুধুমাত্র ভিটে রয়েছে। ওই ভিটেতে আমার স্বামী ও তার ভাই বসবাস করতেন। এখন যদি আমরা কোন ক্ষতিপূরণ না পাই তাহলে দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে কিভাবে চলবে আমাদের পরিবার। আমরা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধান চাই। সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য দেন স্থানীয় সমাজসেবক ইন্দ্রজিৎ দাস খোকন, ইলিয়াস মিয়া, নিহত বিজয়ের চাচাতো ভাই কাজল মালাকার, মেয়ে পপি মালাকার ও প্রিয়া মালাকার।
স্থানীয় ইউপি সদস্য বিধান দত্ত বলেন, উভয়পক্ষকে নিয়ে বৈঠকে বসা হয়েছিল। সিদ্ধান্ত হয়েছিল নিহতের পরিবারকে জমি দেবার। কিন্তু কুরপান আলী প্রস্তাব দেন আগে আপোষনামা, পরে জমি রেজিস্ট্রি। এদিকে নিহতের পরিবার বলতেছে আগে জমি পরে আপোষনামা। এখন বিষয়টি কোন অবস্থায় আছে সেটি আমার জানা নেই।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নূর আহমদ চৌধুরী বুলবুল বলেন, ঘটনার পর দুইপক্ষকে নিয়ে বসা হয়েছিল। নিহতের পরিবার যেহেতু খুবই দরিদ্র সেই দিক চিন্তা করে তার পরিবারের ভরপোষণের জন্য এক কিয়ার (৩০ শতক)জমি রেজিস্টি করে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু অভিযুক্ত কুরপান আলী এখন নানা টালবাহানা শুরু করেছেন। আমরা চাই নিহতের পরিবার যেন ক্ষতিপূরণ পায়।
কুলাউড়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মুহিত মিয়া বলেন, নিহত বিজয়ের পরিবারকে বলেছি মামলা করার জন্য।পরে থানায় মামলা না করে তারা আদালতে মামলা করেছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে নিহত ব্যক্তি মাটি চাপায় মারা গেছেন বলে প্রতিবেদন এসেছে। তিনি বলেন, ঘটনার সমাধানে আমি কোন সময়ক্ষেপণ করিনি। নিহতের পরিবার এখন অহেতুক মিথ্যা অভিযোগ তুলতেছে। বিষয়টি স্থানীয়ভাবে চেয়ারম্যান-মেম্বার সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছিল।
ছবি ক্যাপশন : কুলাউড়ার হাজীপুর ইউনিয়নে মাটি চাপায় নিহত দিনমজুর বিজয়ের পরিবারের লোকজন প্রতিকার না পেয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। নিহতের ছবি সংযুক্ত।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: সাইফুল ইসলাম|
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ১৮৮, এম জে টাওয়ার (৮ম তলা), ফকিরাপুল (বড় মসজিদের পাশে) মতিঝিল, ঢাকা-১০০০। মোবাইল:- ০১৯১৯৯২০০৫৮, ০১৮১৯৯২০০৫৮, ই মেইল: gomtirbarta@gmail.com