এম কে হাসান, জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে এক অভিনব ও ভয়ঙ্কর জালনোট জালিয়াতি চক্রের সন্ধান পেয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এলাকায় ব্রডব্যান্ড ও ওয়াই-ফাই লাইনের কাজ করার অজুহাতে ঘর ভাড়া নিয়ে সেখানে রীতিমতো গড়ে তোলা হয়েছিল পূর্ণাঙ্গ জালনোট তৈরির মিনি কারখানা। আগামী কোরবানির পশুর হাট ও স্থানীয় বাজারগুলোতে কোটি কোটি টাকার জালনোট ছড়িয়ে দেওয়ার এক মহিপরিকল্পনা ছিল এই চক্রের।
আজ রোববার (২৪ মে) দুপুরে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের হ্নীলা মোচনী এলাকায় বিজিবির এক ঝটিকা অভিযানে ১২ লাখ টাকার জালনোটসহ দুইজনকে আটকের পর বেরিয়ে আসে এই গোপন কারখানার চাঞ্চল্যকর তথ্য। পরে ওই কারখানায় অভিযান চালিয়ে আনুমানিক কোটি টাকার ছাপানো জালনোট এবং জালনোট তৈরির বিপুল সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
আটক ব্যক্তিরা হলেন— ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থানার আলাউদ্দিনের ছেলে ফেরিওয়ালা নাজমুল (৩০) এবং টেকনাফের শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আবুল কালামের ছেলে টমটমচালক আজিজুর রহমান (৩৬)।
যেভাবে ধরা পড়ল জালনোটের চালান :- টেকনাফ ব্যাটালিয়ন (২-বিজিবি)-এর উপ-অধিনায়ক মেজর মুবাশশির নাকীব তরফদার জানান, ঈদকে সামনে রেখে জালনোট পাচারের একটি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিজিবির তিনটি আভিযানিক দল মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে কৌশলগত অবস্থান নেয়। দুপুর আড়াইটার দিকে মোচনী এলাকায় স্থাপিত বিজিবির চেকপোস্টের সংকেত অমান্য করে একটি টমটম (ইজিবাইক) দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
এ সময় বিজিবির মোটরসাইকেল টহল দল ধাওয়া করে টমটমটি আটক করে। পরে টমটমে থাকা একটি কালো ব্যাগ তল্লাশি করে ১ হাজার টাকা মূল্যের ১২টি বান্ডেল অর্থাৎ মোট ১২ লাখ টাকার জালনোট এবং ৫ হাজার টাকার আসল বাংলাদেশি মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক নাজমুল স্বীকার করেন, মাত্র ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে এই জালনোটের চালানটি হ্নীলা বাজারে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি।
ইন্টারনেট লাইনের আড়ালে জালনোটের কারখানা :- আটক দুইজনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিজিবি সদস্যরা জাদিমুড়া বাজারের পূর্বপাশে রশিদ আহমদের মালিকানাধীন একটি টিনশেড বাসায় চিরুনি অভিযান চালান। বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে মূল কারবারিরা ঘরে তালা ঝুলিয়ে পালিয়ে গেলেও শেষ রক্ষা হয়নি।
বিজিবি সদস্যরা তালা ভেঙে ঘরের ভেতর প্রবেশ করে হতবাক হয়ে যান। ছোট্ট সেই টিনশেড ঘরটিতেই গড়ে তোলা হয়েছিল জালনোট তৈরির আধুনিক কারখানা। সেখান থেকে :- একটি ল্যাপটপ ও একটি ডেস্কটপ কম্পিউটার, দুইটি অত্যাধুনিক কালার প্রিন্টার, বিপুল পরিমাণ বিশেষ কাগজ ও জালনোট ছাপানোর বিশেষ কালি এবং আনুমানিক কোটি টাকা মূল্যমানের আধা-প্রস্তুত ও প্রস্তুতকৃত ছাপানো জালনোট উদ্ধার করা হয়।
মাত্র ৩ দিন আগেই ভাড়া নেওয়া হয় ঘরটি :- স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মাত্র তিন দিন আগে দুই যুবক নিজেদের ব্রডব্যান্ড ও ওয়াই-ফাই লাইনের টেকনিশিয়ান পরিচয় দিয়ে মাসিক আড়াই হাজার টাকা ভাড়ায় ঘরটি নিয়েছিলেন।
বাড়ির মালিক রশিদ আহমদের স্ত্রী নুর হাবিবা বলেন, ওরা বলেছিল ইন্টারনেট লাইনের কাজ করবে, তাই ঘর ভাড়া দিয়েছিলাম। কিন্তু ভেতরে যে তারা এই সর্বনাশ করছিল, তা আমরা টের পাইনি।
পশুর হাট ও সীমান্ত এলাকা ছিল মূল টার্গেট :- হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এই সীমান্ত এলাকায় ঈদকে সামনে রেখে একটি চক্র পশুর হাট ও স্থানীয় বাজারগুলোকে টার্গেট করে জালনোট ছড়িয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা করছিল।
বিজিবির উপ-অধিনায়ক মেজর মুবাশশির নাকীব তরফদার বলেন, কোরবানির ঈদে গবাদিপশু কেনাবেচার সময় বাজারে যে বিপুল অর্থের লেনদেন হয়, সেই সুযোগটিই নিতে চেয়েছিল এই চক্র। আটক ব্যক্তিদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এই আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় চক্রের মূল হোতা এবং এর পেছনের মূল কুশীলবদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের জন্য বিজিবির বিশেষ অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: সাইফুল ইসলাম|
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ১৮৮, এম জে টাওয়ার (৮ম তলা), ফকিরাপুল (বড় মসজিদের পাশে) মতিঝিল, ঢাকা-১০০০। মোবাইল:- ০১৯১৯৯২০০৫৮, ০১৮১৯৯২০০৫৮, ই মেইল: gomtirbarta@gmail.com