মোঃতানজিলুল ইসলাম লাইক রাজশাহীঃ
রাজশাহীতে প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশের উপস্থিতিতেই ছোটখাটো মব সৃষ্টি করে টেন্ডার বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে, যা প্রশাসনের ভূমিকা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজে চিহ্নিত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতি এবং তাদের সক্রিয় ভূমিকা ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও সামনে এসেছে।
গতকাল ৫ মে (মঙ্গলবার) সকালে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) কার্যালয়ে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় স্থানীয় যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক টেন্ডার বাক্স নিয়ে দরপত্র বের করে দেখার অভিযোগ উঠেছে। পরে বাক্সটি ফেরত দেওয়া হলেও পুরো ঘটনাটি ঘিরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
আরডিএ সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন পুরনো ও অচল মালামাল বিক্রির লক্ষ্যে সম্প্রতি একটি নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এসব মালামালের মধ্যে ছিল কয়েকটি শৌচাগারের পুরনো দুটি বিলবোর্ড, আরডিএ পার্কের ছোট-বড় ২৭টি গাছ, ঢাকা লিঁয়াজোঁ অফিসের পাঁচটি সোলার প্যানেল, ১৪টি ব্যাটারি এবং একটি লিফটের ভাঙা যন্ত্রাংশসহ আরও কিছু উপকরণ। প্রায় আড়াই লাখ টাকার এসব মালামাল ক্রয়ের জন্য প্রায় ৪৫০ জন শিডিউল সংগ্রহ করেছিলেন।
গত ২৭ এপ্রিল থেকে দরপত্র গ্রহণ শুরু হয় এবং মঙ্গলবার দুপুর ১টা পর্যন্ত ছিল জমা দেওয়ার শেষ সময়। শেষ দিনে টেন্ডার বাক্সের নিরাপত্তায় পুলিশের উপস্থিতিও নিশ্চিত করা হয়েছিল। তবে সেই উপস্থিতির মধ্যেই ছোটখাটো মব তৈরি করে টেন্ডার বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, সকালে যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন নেতাকর্মী দরপত্র জমা দিতে এসে আপত্তি তোলেন। তাদের দাবি ছিল, আগেই কিছু দরপত্র বাক্সে জমা পড়ে গেছে, যা বাতিল করতে হবে। তাদের মতে, শুধুমাত্র ওই দিনের জমা দেওয়া দরপত্রই গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত। আরডিএ কর্মকর্তারা নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলেও তারা তা মানেননি। এক পর্যায়ে তারা জটলা সৃষ্টি করে পরিস্থিতিকে উত্তেজনাপূর্ণ করে তোলে এবং ছোটখাটো মব আকার ধারণ করে।
একপর্যায়ে ১৮ নং ওয়ার্ড দক্ষিণ যুবদলের আহ্বায়ক মোঃ ধলু শেখ পুলিশের উপস্থিতিতেই টেন্ডার বাক্সটি তুলে নেন। এ সময় তার সহযোগী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মোঃ শাহীন, যিনি আগে যুবলীগের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে ধলুর সহযোগিতায় যুবদলের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। শাহীন পুলিশের সঙ্গে উচ্চস্বরে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। পরে ধলু টেন্ডার বাক্সটি নিয়ে কার্যালয়ের করিডোরে চলে যান এবং সেখানে অন্যান্য যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল সহ অনেকে তাদের সহযোগিতা করেন। এরপর বাক্স খুলে আগের জমা দেওয়া দরপত্রগুলো বের করে দেখা হয়। পরবর্তীতে বাক্সটি আবার পুলিশের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
ঘটনার সময় উপস্থিত ও জড়িতদের মধ্যে আরও ছিলেন—সপুড়া এলাকার যুবদল নেতা রাব্বি ও আরজু, ভাটার মোড়ের আলিফ লাম মিম, যুবদল নেতা শরীফ, ১৪ নং ওয়ার্ড যুবদলের সদস্য সচিব রিদয়, চন্দ্রিমা থানার সাবেক স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব মোঃ সাগর, শাহ মখদুম থানার স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মামুন, একই থানার সদস্য সচিব বাধন, সাবেক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা রেজভী, ১৮ নং ওয়ার্ড ছাত্রদলের মিদুল, মাথা ফুলা বাবু (নিকো মাস্টার), পপেল (যিনি আগে যুবলীগে ছিলেন, বর্তমানে যুবদলে), ভাঙড়ি ব্যবসায়ী সাদ্দাম এবং সোহেল টোকাইসহ আরও বেশ কয়েকজন ভাড়াটে ক্যাডার।
ঘটনার সিসি ক্যামেরা ফুটেজে দেখা গেছে, টেন্ডার বাক্স নেওয়ার পুরো সময়জুড়ে পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও তারা কার্যত কোনো বাধা দেননি, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে তাদের ভূমিকা নিয়ে।
পরবর্তীতে বাক্সটি ফেরত পাওয়ার পর দুপুর আড়াইটার দিকে তা খোলা হয়। তখন চারটি গ্রুপের জন্য মোট নয়টি দরপত্র পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি গ্রুপে পাঁচটি এবং বাকি তিনটি গ্রুপে চারটি করে দরপত্র ছিল। তবে আগের দরপত্রগুলো যথাযথভাবে পুনরায় বাক্সে রাখা হয়েছিল কিনা, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নগর যুবদলের আহ্বায়ক শরিফুল ইসলাম জনি বলেন, এ ঘটনায় যুবদলের কেউ জড়িত কিনা তা তার জানা নেই এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মীর তারেক বলেন, “রাজশাহীতে স্বেচ্ছাসেবক দল জনগণের দল হিসেবে পরিচিত। টেন্ডার জনগণের হক—এতে কেউ বিঘ্ন ঘটালে তা গুরুতর অপরাধ। আমাদের দলের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি।”
অন্যদিকে, শাহ মখদুম থানার স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মামুন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “কোনো লুটপাট হয়নি। অনিয়ম হওয়ায় টেন্ডার বক্স কিছুক্ষণের জন্য সরিয়ে রাখা হয়েছিল।”
এ বিষয়ে ধলুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ফোন রিসিভ করেন শাহীন। তিনি বলেন, “আমি এই বিষয়ে কিছু বলতে চাই না, ধলু ওয়াশরুম থেকে বের হলে তার সঙ্গে কথা বলেন।” তবে পরবর্তীতে তাদের কারও সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার আরেকজন কথিত মূল হোতা হিসেবে পরিচিত মাথা ফুলা বাবু, যিনি ‘নিকো মাস্টার’ নামেও পরিচিত। বিভিন্ন দপ্তর, ঠিকাদার ও রাজনৈতিক মহলে তিনি এ নামেই পরিচিত বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ভাঙড়ি ও গাছের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে তিনি বিভিন্ন জায়গায় প্রভাব বিস্তার করে আসছেন এবং টাকার ভাগাভাগির সঙ্গে জড়িত। এমনকি বিগত সরকারের সময় থেকেই তিনি এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। ৫ আগস্টের পরও টাকার প্রভাব খাটিয়ে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের ছত্রছায়ায় থেকে প্রভাব বিস্তার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় তার মাধ্যমে ভাড়াটে ক্যাডার ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে নিকো মাস্টার বাবু বলেন, “আমি টেন্ডার ড্রপ করতে গিয়েছিলাম। সেখানে চিৎকার-চেঁচামেচি ও ভিড় দেখে আমি শুধু বাক্সে ফুটা দিয়ে উঁকি মেরে দেখেছি ভেতরে কোনো টেন্ডার ফেলা হয়েছে কি না, এরপর চলে এসেছি। তাদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।” যদিও কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি আবার বলেন, “আমরা সবাই এখন একসাথেই বসে আছি,”—যা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
আরডিএর সহকারী প্রকৌশলী কাজী আসাদুজ্জামান বলেন,
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: সাইফুল ইসলাম|
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ১৮৮, এম জে টাওয়ার (৮ম তলা), ফকিরাপুল (বড় মসজিদের পাশে) মতিঝিল, ঢাকা-১০০০। মোবাইল:- ০১৯১৯৯২০০৫৮, ০১৮১৯৯২০০৫৮, ই মেইল: gomtirbarta@gmail.com