এম কে হাসান, জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
প্রধানমন্ত্রীর কক্সবাজার সফরকে ঘিরে কক্সবাজার-৩ (সদর, রামু ও ঈদগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল তাঁর সংসদীয় এলাকার সার্বিক উন্নয়ন ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রী করণে ১০ দফার একটি ডিও পত্র (উন্নয়ন প্রস্তাবনা) পেশ করেছেন। তবে এই বৃহৎ ও দীর্ঘমেয়াদি মহা পরিকল্পনায় কক্সবাজারের বর্তমান বাস্তবতার সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমূহ - জেলা সদর হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার পরিধি বৃদ্ধি, সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তায় ‘সী নেটিং’ ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা পরিস্থিতি - সম্পূর্ণ উপেক্ষিত রয়ে গেছে। প্রায় ৪৫ লাখ মানুষের জীবন, সুরক্ষা ও নিরাপত্তার সাথে জড়িত এই মৌলিক দাবি গুলো বাদ পড়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
সংসদ সদস্যের দেওয়া ১০ দফা প্রস্তাবনায় কক্সবাজারের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক খোলনলচে বদলে দেওয়ার মতো কিছু দূরদর্শী দাবি স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সমুদ্র সম্পদ ভিত্তিক গবেষণা (ব্লু-ইকোনমি) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, পর্যটন খাতে বিনিয়োগ সহজীকরণ, কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করণ, রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নকে পৌরসভায় রূপান্তর, রামুর পূর্বাঞ্চল নিয়ে ‘বাঁকখালী’ নামে নতুন উপজেলা গঠন, কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীত করণ, নবগঠিত ঈদগাঁও উপজেলার প্রশাসনিক অবকাঠামো উন্নয়ন, লবণ বোর্ড গঠন, আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু এবং জলবায়ু উদ্বাস্তু ও ভূমিহীন মানুষের পুনর্বাসণ কর্মসূচি।
এই দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গুলোকে স্থানীয় সচেতন মহল ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও, সমসাময়িক সবচেয়ে বড় সংকট চিকিৎসাসেবা, পর্যটক মৃত্যু এবং আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এড়িয়ে যাওয়ায় প্রস্তাবনাটির পূর্ণাঙ্গতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
*চিকিৎসাসেবা যেন এক ‘মরীচিকা’*:- ৪৫ লাখ মানুষের ভরসা এক জেলা সদর হাসপাতাল,
অনুসন্ধানে দেখা যায়, কক্সবাজার জেলায় বর্তমানে স্থায়ী অধিবাসী প্রায় ২৯ লাখ। এর সাথে যুক্ত হয়েছে উখিয়া-টেকনাফে আশ্রিত ১৫ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী। এছাড়াও পর্যটন মৌসুম কিংবা সাধারণ সময়ে প্রতিদিন গড়ে আরও ১ থেকে ২ লাখ দেশি-বিদেশি পর্যটকসহ (বিভিন্ন মেঘা উন্নয়ন প্রকল্প)এই পর্যটন রাজধানীতে অবস্থান করেন। সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ লাখ মানুষের জরুরি ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র প্রধান সরকারি আশ্রয়স্থল ‘কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল’।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আড়াইশ শয্যার এই হাসপাতালটি বর্তমান জনসংখ্যার চাপে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছে। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি রোগী প্রতিদিন এখানে চিকিৎসাধীন থাকেন। শয্যা না পেয়ে বারান্দা ও মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হয় রোগীদের। উপরন্তু, কিডনি ডায়ালাইসিস, ক্যাথল্যাব, আইসিইউ (ICU), সিসিইউ (CCU) সংকট এবং প্রয়োজনীয় আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে প্রতিনিয়ত মুমূর্ষু রোগীদের চট্টগ্রামে রেফার করতে হয়, যার ফলে পথেই অনেকের মৃত্যু ঘটে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে এই জেলা সদর হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ১০০০-এ উন্নীত করণ এবং জটিল রোগের চিকিৎসার পরিধি বাড়ানোর দাবিটিই ছিল এই অঞ্চলের মানুষের প্রথম ও প্রধান দাবি, যা এমপির উন্নয়ন রূপরেখায় স্থান পায়নি।
*আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা সংকট*:- প্রস্তাবনায় আইন শৃঙ্খলা বিষয়ক মেলেনি কোনো সমাধান, কক্সবাজারের ভৌগোলিক অবস্থান ও বিশাল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপস্থিতির কারণে এখানকার আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। মাদক চোরাচালান (বিশেষ করে ইয়াবা ও আইস), অস্ত্র কেনাবেচা, রোহিঙ্গা ক্যাম্প কেন্দ্রিক অপরাধ প্রবণতা এবং অপহরণের মতো ঘটনা জেলা জুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক তৈরি করেছে।
বিশেষ করে পর্যটন জোন ও মহাসড়ক গুলোতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নবগঠিত ঈদগাঁও উপজেলা সহ গ্রামীণ জনপদে অপরাধ দমনে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষায়িত ইউনিট বা ফাঁড়ি বাড়ানোর দাবি দীর্ঘদিনের। প্রধানমন্ত্রীর সফরে যেখানে এই জননিরাপত্তার বিষয়ে বিশেষ বরাদ্দের দাবি তোলার কথা ছিল, সেখানে এমপির ১০ দফায় আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার কোনো সুনির্দিষ্ট রোড ম্যাপ বা দাবি না থাকায় স্থানীয়রা চরম ভাবে হতাশ হয়েছেন।
*মৃত্যুকূপ হতে চলা সৈকতে নেই ‘সী-নেটিং’ ও সুরক্ষা জাল*:-
বিশ্বের দীর্ঘতম ১২০ কিলোমিটারের অবিচ্ছিন্ন সমুদ্র সৈকত পরিবেষ্টিত কক্সবাজার এখন দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক করিডোর। তবে প্রতি বছরই উত্তাল সমুদ্রে গোসল করতে নেমে গুপ্তখাল বা চোরা স্রোতের (Rip Current) ও চোরা বালির টানে প্রাণ হারাচ্ছেন অসংখ্য পর্যটক ও স্থানীয় লোকজন।
পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানান, আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র গুলোতে পর্যটকদের সাঁতার কাটার জন্য সমুদ্রের একটি নির্দিষ্ট অংশ ‘সী নেটিং’ (সুরক্ষাজাল) দিয়ে নিরাপদ করা থাকে, যার ভেতরে হাঙ্গর বা চোরা স্রোতের ভয় থাকে না। কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র করার জন্য ১০ দফায় বিনিয়োগ সহজী করণের কথা বলা হলেও, পর্যটকদের জীবন বাঁচানোর এই প্রাথমিক ও অত্যাবশ্যকীয় ‘সী নেটিং’ বা আধুনিক লাইফ গার্ড ব্যবস্থার কোনো উল্লেখ সেখানে নেই। ফলে পর্যটকদের নিরাপত্তা ও লাইফ সাপোর্ট নিশ্চিত না করে কীভাবে পর্যটন খাতের বিকাশ ঘটবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ পর্যটন সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা। যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা:-কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ বলেন, এমপি সাহেব যে ১০টি দাবি দিয়েছেন তা দূরদর্শী ও প্রশংসনীয়। কিন্তু যে মানুষ গুলো বাঁচলে এই উন্নয়ন ভোগ করবে, সেই মানুষের জীবন বাঁচানোর হাসপাতাল, আইন শৃঙ্খলা আর সমুদ্র সৈকতের সুরক্ষাই যদি নিশ্চিত না হয়, তবে এই অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধারণ মানুষের কতটা কাজে আসবে? আমরা আশা করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজ উদ্যোগে এই জনগুরুত্বপূর্ণ প্রাণের দাবি গুলো আমলে নিয়ে জরুরি নির্দেশনা জারি করবেন।
সংসদ সদস্যের এই উন্নয়ন সনদে জেলার সামগ্রিক অর্থনীতির চিত্র ফুটে উঠলেও, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে বড় তিন সংকট— চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা উপেক্ষিত থাকায় তা এখন কক্সবাজারের প্রধান রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: সাইফুল ইসলাম|
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ১৮৮, এম জে টাওয়ার (৮ম তলা), ফকিরাপুল (বড় মসজিদের পাশে) মতিঝিল, ঢাকা-১০০০। মোবাইল:- ০১৯১৯৯২০০৫৮, ০১৮১৯৯২০০৫৮, ই মেইল: gomtirbarta@gmail.com