বরগুনা প্রতিনিধি।।
বরগুনার ১০নং নলটোনা ইউনিয়নের আজগরকাঠীতে অবৈধ কাঠের চুল্লি ঘিরে নেমে এসেছে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়। কয়েক বছর আগে মাত্র তিনটি চুল্লি স্থাপন করলে স্থানীয়দের অভিযোগে তা ভেঙে দেয় প্রশাসন। কিন্তু পরে আইনকে তোয়াক্কা না করে এবং প্রভাব খাটিয়ে ‘মৃত’ চুল্লিগুলো ফের জেগে ওঠে। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০টি—যা স্থানীয়রা আখ্যা দিচ্ছেন “মৃত্যু কারখানা” হিসেবে।
দিন–রাত বিষাক্ত ধোঁয়ায় মৃত্যু–ফাঁদে জনপদ
কয়লা উৎপাদনের নামে এসব চুল্লি থেকে সারাদিন–সারারাত ঘন কালো ধোঁয়া উঠছে। পুরো গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে তীব্র বিষাক্ততা। ফসল, গাছপালা, পশুপাখি—সবই এতে ক্ষতিগ্রস্ত। মৌসুমি আমসহ বিভিন্ন ফলজ গাছে এখন ফুল–ফল থাকার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। আমের মুকুল শুকিয়ে যাচ্ছে, ফল ঝরে পড়ছে, শাকসবজি পুড়ে ধূসর, ধানের দানা কমে যাচ্ছে।
কৃষক আবুল কালাম বলেন, চুল্লি থাকলে ফসল ঘরে তোলা সম্ভব না। ধোঁয়া এসে পাতাসহ গাছ পুড়ে মারা যাচ্ছে।
শিশু–নারী–বৃদ্ধ সবাই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে
অবৈধ চুল্লির ধোঁয়ায় এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে—শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, চোখ জ্বালা, মাথা ব্যথা, বমি ও তীব্র এলার্জি।
গৃহবধূ শিরিন আক্তার ময়না জানান,
রাতে বাচ্চাদের নিয়ে ঘরে থাকা যায় না। ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করে। অভিযোগ করলেই হুমকি আসে।
স্থানীয় প্রবাসী (মালয়েশিয়া) সবুজ বলেন,
তিনটা চুল্লি ভেঙে দেওয়ার পর ভেবেছিলাম শান্তি পাবো, এখন তো দশটা!
রাঘববোয়ালের পৃষ্ঠপোষকতায় রাতারাতি গড়ে ওঠা চুল্লি। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করলেই চুল্লির মালিকেরা চাঁদাবাজি মামলা- সহ প্রাণনাশের হুমকি দেন। তিনি আরো বলেন,অবৈধ চুল্লির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অধিদপ্তরে অভিযোগ দেওয়ার পর তাদের ভয়তে পরিবার নিয়ে পালিয়ে থাকতে হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ—প্রভাবশালী একটি চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় রাতারাতি নতুন চুল্লি গড়ে ওঠে।এক–দুইবার অভিযান চালালেও তা টেকসই হয় না।সাহসী কেউ মুখ খুললেই নেমে আসে হুমকি।
চুল্লির মালিক কবির মৃধা স্বীকার করেন,
চুল্লির কোনো অনুমোদন নেই।
চুল্লির আরেক মালিক মাসুদ ফিটার বলেন,আমরা এটার বৈধতা আনার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরে ঘোরাঘুরির পর জানতে পারলাম,এটি বিড়ি সিগারেটের মত! পাপও না পূর্ণ ও না, মাকরূহ অর্থাৎ এটি বৈধও না অবৈধ না মাকরূহ। এতে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হয় না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দোষ স্বীকার করেই তারা দাপট দেখিয়ে এখনও চুল্লি চালাচ্ছে—কারণ তাদের ‘রক্ষা করার’ মতো শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষকতা আছে।
বরগুনা সদর থানার ওসি মো. আবদুল আলীম বলেন, বাবুগঞ্জ ফাঁড়িকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইউএনওর সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হায়াত মাহমুদ রকিব জানান,
আগামী ৩–৫ দিনের মধ্যেই অবৈধ চুল্লি ভেঙে ফেলা হবে। এর পরেও যদি চুল্লি তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। এদের বিরুদ্ধে এর আগের একটি মামলা চলমান রয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সজল চন্দ্র শীল জানিয়েছেন,যত ক্ষমতাবানই হোক—অবৈধ চুল্লির বিরুদ্ধে অভিযান হবে।
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী—
অনুমোদন ছাড়া কাঠ পুড়িয়ে কয়লা উৎপাদন করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
আজগরকাঠীর এসব চুল্লি তাই আইন লঙ্ঘনের স্পষ্ট উদাহরণ।
সচেতন মহল বলছে—কঠোর পদক্ষেপ না নিলে এ অঞ্চল অচিরেই স্থায়ী পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। ফসল, জনস্বাস্থ্য ও বায়ুমণ্ডল সবই এখন চরম ঝুঁকিতে।
স্থানীয়রা দ্রুত অভিযান চালিয়ে সব চুল্লি বন্ধ এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন।


