- আকিবুজ্জামিন ( আন্তর্জাতিক ডেক্স )
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তা বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তার শঙ্কা তৈরি করলেও, এর সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাতটি আসতে চলেছে বাংলাদেশের ওপর। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ঢেউ ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের উপকূল ছুঁয়েছে, যা উন্নয়নশীল এই দেশটিকে এক ভয়াবহ বহুমুখী সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশ কেবল উচ্চ মূল্যস্ফীতি নয়, বরং বাস্তবসম্মত দুর্ভিক্ষের (Famine) মুখোমুখি হতে পারে।
বর্তমান বাস্তবতা: দেশজুড়ে হাহাকার
জাতিসংঘের সতর্কবার্তা তাত্ত্বিক পর্যায়ে থাকলেও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য এটি ইতিমধ্যেই একটি জীবন্ত যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে। আমরা যদি দেশের বর্তমান বাস্তবতার দিকে তাকাই, তবে চিত্রটি অত্যন্ত ভয়াবহ।
১. জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুতের বিপর্যয়: দেশের প্রায় প্রতিটি প্রান্তে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন দৈনন্দিন দৃশ্য। সরকার আমদানির ব্যয় মেটাতে না পারায় সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ খাতে। তীব্র লোডশেডিং শুধু জনজীবনকে অতিষ্ঠ করেনি, শিল্প উৎপাদনকেও স্থবির করে দিয়েছে। কলকারখানাগুলো চালু রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ছে, যার ফলে উৎপাদন কমছে এবং বেকারত্বের ঝুঁকি বাড়ছে।
২. কৃষি খাতে সরাসরি আঘাত ও সারের সংকট: সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো কৃষি। বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ, কিন্তু বর্তমান সংকট কৃষির মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। চৈত্র-বৈশাখ মাসে বোরো ও আউশ ধানের সেচের জন্য প্রচুর ডিজেলের প্রয়োজন হয়, কিন্তু কৃষকরা পাম্প সচল রাখার জন্য পর্যাপ্ত ডিজেল পাচ্ছেন না। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সারের তীব্র সংকট। চড়া দামে সার ও জ্বালানি কিনে চাষাবাদ করা কৃষকদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। অনেক কৃষক ইতিমধ্যেই চাষাবাদ ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন।
৩. চাষাবাদের জন্য ‘টানাটানি’: দেশের উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান কৃষি অঞ্চলগুলোতে সেচ ব্যবস্থা, সার ও বিদ্যুৎ—সবকিছুতেই ‘টানাটানি’ দেখা দিয়েছে। কৃষকরা হাহাকার করছেন। কৃষি কর্মকর্তারাও অসহায়ত্ব প্রকাশ করছেন। যদি এই মৌসুমে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হয়, তবে সামনের দিনগুলোতে চালের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার পুরোপুরি বাইরে চলে যাবে।
বিশ্লেষণ: বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকির মধ্যে?
অর্থনীতিবিদ এবং কৃষি বিজ্ঞানীরা একমত যে, বাংলাদেশ এখন স্বাধীনতার পর অন্যতম বড় অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। এর কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
আমদানিনির্ভরতা ও ডলারের সংকট: বাংলাদেশ খাদ্যশস্য (বিশেষ করে গম ও ভোজ্যতেল) এবং জ্বালানি তেলের জন্য পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে এই পণ্যগুলোর দাম মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে আকাশচুম্বী হয়েছে। অন্যদিকে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ডলারের অভাবে এলসি (LC) খোলা যাচ্ছে না, যার ফলে খাদ্য ও জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হচ্ছে।
তীব্র মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতার অবলুপ্তি: ইতিমধ্যেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বেড়েছে। সাধারণ মানুষ এক বেলা খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছে। যদি জ্বালানি ও সারের সংকটের কারণে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমে যায়, তবে চাল ও অন্যান্য খাদ্যের দাম এতটাই বাড়বে যে, দেশের একটি বড় অংশের মানুষ না খেয়ে মরার ঝুঁকিতে পড়বে।
ভবিষ্যতের পূর্বাভাস: ভয়াবহ মানবিক সংকট
যদি বর্তমান পরিস্থিতি আগামী কয়েক মাস অব্যাহত থাকে, তবে বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতের পূর্বাভাস অত্যন্ত অন্ধকারাচ্ছন্ন।
দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা: এটি আর কোনো অমূলক আশঙ্কা নয়। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে এবং ডলারের অভাবে খাদ্য আমদানি করা না গেলে, দেশে খাদ্যের বাস্তব ঘাটতি দেখা দেবে। মজুদ ফুরিয়ে গেলে দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বিপন্ন মানবিক অবস্থা: অপুষ্টি, দুর্ভিক্ষজনিত রোগব্যাধি এবং মৃত্যুহার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী এবং বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকবেন।
সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা: খাদ্যের অভাব মানুষকে বেপরোয়া করে তুলবে। চালের ট্রাক লুটপাট, রেশন শপের সামনে দাঙ্গা এবং ব্যাপক সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, যা দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে পুরোপুরি ভেঙে দিতে পারে।
শিল্প ও অর্থনীতি ধ্বংস: বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অভাবে কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেলে দেশের রপ্তানি খাত (তৈরি পোশাক) ধ্বংস হয়ে যাবে। এতে কোটি কোটি মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বে, যা দারিদ্র্যকে আরও ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে যাবে।
করণীয়: আর এক মুহূর্ত সময় নেই
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞরা সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে ‘যুদ্ধকালীন’ পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন:
কৃষিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার: যেকোনো মূল্যে কৃষকদের ডিজেল, সার ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে অন্যান্য খাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রেখেও কৃষিকে সচল রাখতে হবে। সরকারেকৃষকদের জন্য বিশেষ নগদ সহায়তা এবং ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।
খাদ্য মজুত ও বিকল্প উৎস: দেশের বিদ্যমান খাদ্য মজুত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং অপচয় রোধ করতে হবে। দ্রুত ডলারের ব্যবস্থা করে বিকল্প দেশ থেকে (যেমন ভারত বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) খাদ্য আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে।
জ্বালানি সাশ্রয় ও rationing: অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে হবে। জ্বালানি তেলের rationing চালু করতে হবে যাতে কৃষি ও পরিবহন খাত সচল থাকে।
আন্তর্জাতিক সাহায্য: অবিলম্বে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের কাছে বিশেষ করে জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক এবং বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর কাছে জরুরি খাদ্য ও আর্থিক সহায়তার আবেদন করতে হবে।
সর্বোপরি, বাংলাদেশ এখন এক ভয়াবহ সংকটের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্ববাজারের এই পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা মিলে দেশকে এক বিপন্ন অবস্থায় নিয়ে গেছে। দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে, বাংলাদেশের সামনে এক মানবিক বিপর্যয় অনিবার্য। সময় খুব কম।
{ একটি রিসার্চ প্রতিবেদন তথ্যে সামান্য ভূল থাকতে পারে }
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: সাইফুল ইসলাম|
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ১৮৮, এম জে টাওয়ার (৮ম তলা), ফকিরাপুল (বড় মসজিদের পাশে) মতিঝিল, ঢাকা-১০০০। মোবাইল:- ০১৯১৯৯২০০৫৮, ০১৮১৯৯২০০৫৮, ই মেইল: gomtirbarta@gmail.com