কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি ঃ
মোঃ জাকারিয়া হোসেন
বর্তমান বিশ্বে বেকারত্ব অন্যতম বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা না গেলে একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেমন বাধাগ্রস্ত হয়, তেমনি বাড়ে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও সামাজিক অস্থিরতা। কর্মসংস্থান শুধু মানুষের আয়ের উৎস নয়, এটি একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে বেকারত্বের হার প্রায় ৪ দশমিক ৮ থেকে ৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জন কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে প্রায় পাঁচজন বেকার। সংখ্যার হিসেবে বিশ্বজুড়ে বেকারের সংখ্যা ২০ থেকে ২১ কোটির কাছাকাছি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেকারত্বের হার ভিন্ন হলেও সমস্যাটি সর্বত্রই বিদ্যমান। যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার প্রায় ৪ থেকে ৪.৫ শতাংশ, জার্মানিতে ৫ থেকে ৬ শতাংশ, ফ্রান্সে ৭ থেকে ৮ শতাংশ এবং স্পেনে ৯ থেকে ১০ শতাংশ। অর্থনৈতিক নীতি, শ্রমবাজারের কাঠামো ও বিনিয়োগ পরিস্থিতির কারণে দেশভেদে এ পার্থক্য দেখা যায়।
এশিয়ার সার্কভুক্ত দেশগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। শ্রীলঙ্কায় বেকারত্বের হার ৪ থেকে ৫ শতাংশ, পাকিস্তানে ৭ থেকে ৮ শতাংশ এবং ভারতে ৫ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা অনেক দেশেই নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক বাস্তবতার বাইরে নয়। দেশে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা ২৬ থেকে ২৭ লাখের কাছাকাছি। এর মধ্যে বড় অংশই তরুণ জনগোষ্ঠী। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ, যা দেশের শ্রমবাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছে না।
কুড়িগ্রামের বাস্তবতা
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা কুড়িগ্রাম কর্মসংস্থান সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। প্রায় ২৩ লাখ মানুষের এই জেলাটি কৃষি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সম্ভাবনাময় হলেও দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।
ভারতের সঙ্গে কুড়িগ্রামের ২৭৮ দশমিক ২৮ কিলোমিটার আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। প্রশাসনিকভাবে জেলাটি ৯টি উপজেলা, ৭২টি ইউনিয়ন ও ১ হাজার ৮৭২টি গ্রাম নিয়ে গঠিত। সীমান্তবর্তী অবস্থান একদিকে যেমন বাণিজ্যের সম্ভাবনা তৈরি করেছে, অন্যদিকে সীমান্তকেন্দ্রিক নানা সমস্যারও জন্ম দিয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে বেকারত্বের হার কয়েক শতাংশের মধ্যে থাকলেও কুড়িগ্রামের বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। এখানে বেকারত্বের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মৌসুমি কর্মহীনতা, কৃষিনির্ভর জীবিকার অনিশ্চয়তা, শিল্প প্রতিষ্ঠানের অভাব, দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব।
জেলাটি ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমারসহ ১৬টির বেশি নদ-নদী বেষ্টিত। নদীভাঙনে প্রতিবছর বহু মানুষ বসতভিটা, কৃষিজমি ও জীবিকার উৎস হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। ফলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বারবার ব্যাহত হয়।
এছাড়া জেলার সাক্ষরতার হার প্রায় ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ। তাই মানসম্মত শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো সময়ের দাবি। বর্তমান শ্রমবাজারে শুধু শিক্ষিত নয়, দক্ষ জনশক্তির চাহিদাই বেশি।
কুড়িগ্রামের সংকটের পেছনে আরও রয়েছে দুর্বল শাসনব্যবস্থা, আইনের অসম প্রয়োগ, রাজনৈতিক মেরুকরণ, সামাজিক বৈষম্য, শিক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং মাদকের বিস্তার। সীমান্তবর্তী হওয়ায় মাদক চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধের ঝুঁকিও তরুণ সমাজের জন্য উদ্বেগের কারণ।
সমস্যার পাশাপাশি কুড়িগ্রামের রয়েছে ব্যাপক সম্ভাবনা। সঠিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং কার্যকর নীতিমালার মাধ্যমে জেলার অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সোনাহাট স্থলবন্দর কুড়িগ্রামের অন্যতম বড় সম্ভাবনা। এ বন্দরের মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-ভুটান অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে নতুন শিল্প, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।
একইভাবে চিলমারী নদীবন্দর ভারতের আসামের ধুবড়ি বন্দরের সঙ্গে কার্যকর নৌ-যোগাযোগ স্থাপন করতে পারলে আঞ্চলিক বাণিজ্যে নতুন গতি আসবে।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কুড়িগ্রাম টেক্সটাইল মিল পুনরায় চালু করা, বিসিক শিল্পনগরীতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ ঘটাতে পারলে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
কৃষি গবেষণা ও দক্ষ জনশক্তি
কৃষিনির্ভর এই জেলায় কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার কেন্দ্র। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, উন্নত জাতের ফসল উদ্ভাবন, কৃষি গবেষণা এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে জেলার অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
তরুণদের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে পারলে কৃষি, শিল্প ও সেবাখাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
সরকারের সুদৃষ্টি এখন সময়ের দাবি
কুড়িগ্রামের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সংকট নিরসনে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সরকারের বিশেষ নজর। নদীভাঙন, সীমিত শিল্পায়ন, দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত বৈষম্য এবং বিনিয়োগের ঘাটতি দূর করতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়তা, কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং সীমান্তভিত্তিক বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করা গেলে জেলার অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
কুড়িগ্রামকে শুধুমাত্র দারিদ্র্য, নদীভাঙন কিংবা বেকারত্বের জেলা হিসেবে দেখার সময় শেষ। পরিকল্পিত শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং সীমান্তভিত্তিক বাণিজ্যের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে কুড়িগ্রাম উত্তরাঞ্চলের অন্যতম অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের সমন্বয়ে কুড়িগ্রাম একদিন কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের সফল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
তরুণ লেখক ও কলামিস্ট
মোঃ মাকসুদ মেহেদী বকসী।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: সাইফুল ইসলাম|
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ১৮৮, এম জে টাওয়ার (৮ম তলা), ফকিরাপুল (বড় মসজিদের পাশে) মতিঝিল, ঢাকা-১০০০। মোবাইল:- ০১৯১৯৯২০০৫৮, ০১৮১৯৯২০০৫৮, ই মেইল: gomtirbarta@gmail.com