ফাহিম হোসেন রিজু
ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি:
গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের ৩২৩টি পৌরসভার মেয়রকে অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেয় স্থানীয় সরকার বিভাগ। সেই ক্রান্তিলগ্নে যখন দেশজুড়ে নাগরিক সেবা ও উন্নয়ন স্থবির হয়ে পড়ার চরম আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, ঠিক তখনই সততা, কর্মদক্ষতা ও সুশাসনের এক ব্যতিক্রমী ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক মো. আব্দুল-আল-মামুন কাওসার শেখ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করা ৩৮তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের এই কর্মকর্তা সরকারি সেবক হয়েও নিজ কর্মদক্ষতায় ঘোড়াঘাট পৌরসভার জন্মলগ্ন থেকে এ যাবৎকালের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন। গত ২০২৪ সালের ১১ জুলাই ঘোড়াঘাটে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর থেকেই কর্মক্ষেত্রের প্রতিটি জায়গায় আমূল পরিবর্তন এনেছেন ময়মনসিংহের এই কৃতি সন্তান।
পৌর এলাকার সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের অবহেলার অবসান ঘটিয়েছেন বর্তমান পৌর প্রশাসক। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পৌর এলাকায় এখন পর্যন্ত মোট ২৩.৮৩৮ কিলোমিটার রাস্তা পাকাকরণের কাজ শুরু করেছেন, যার আনুমানিক ব্যয় প্রায় ৯ কোটি টাকা (বর্তমানে কাজ চলমান)। শুধু সড়ক ব্যবস্থাপনাই নয়, গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্রগুলোকে সচল করতে ওসমানপুর বাজারের ভেতরের গলি ও শেড এবং বাগেরহাট বাজারের গলি ও আধুনিক কিচেন মার্কেট নির্মাণ করেছেন তিনি। অন্ধকারাচ্ছন্ন পথগুলোকে নিরাপদ ও আলোকিত করতে বসানো হয়েছে আধুনিক স্ট্রিট লাইট। এছাড়াও ঘোড়াঘাট বাস স্ট্যান্ডে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে পৌরসভার পক্ষ থেকে আধুনিক যাত্রী ছাউনি তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।
পৌরসভার ৭ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা গোলাম রব্বানী নিজের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করে বলেন, “আমার জন্মলগ্ন থেকে আমাদের বাড়ির রাস্তাটি কাঁচা ছিল, ইতিপূর্বে কেউ এটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়নি। এসিল্যান্ডের মতো একজন সৎ ও কর্মনিষ্ঠ মানুষ দায়িত্বে আছেন বিধায় আজ এই কাজগুলো সম্ভব হচ্ছে। এছাড়াও তিনি পৌরসভা ও ভূমি সেবায় অফিশিয়াল কার্যক্রম সকলের জন্য অত্যন্ত সহজ করে দিয়েছেন।”
পৌরসভার প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছেন এই কর্মকর্তা। তিনি দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ১৮ মাস (চলমান)। কিন্তু এই ১৮ মাসের দায়িত্বকালীন সময়ে তিনি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মোট ৩৪ মাসের বকেয়া ও নিয়মিত বেতন-ভাতা পরিশোধ করেছেন! তাঁর যোগদানের পূর্বে যেখানে দীর্ঘ ১৯ মাসের বেতন বকেয়া থাকায় কর্মচারীরা মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন, সেখানে তিনি নিজের মেয়াদের বেতন নিয়মিত দেওয়ার পাশাপাশি পূর্বের বকেয়াও পরিশোধ করেছেন। ফলে দীর্ঘদিনের বকেয়া এখন মাত্র ৭ মাসে নেমে এসেছে।
পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার পারভেজ এই বিষয়ে বলেন, “বেতন-ভাতা দীর্ঘদিন বকেয়া থাকায় আমাদের অধিকাংশ কর্মচারীর পরিবার খুবই কষ্টে দিনাতিপাত করছিল। নতুন পৌর প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর আমাদের ৩৪ মাসের বকেয়া ও নিয়মিত বেতন পরিশোধ করেছেন, যা সকল কর্মচারীদের মাঝে এক বিশাল স্বস্তি এনে দিয়েছে।”
এর পাশাপাশি গত ৩০ জুন (২০২৫) তারিখে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের জন্য ঘোড়াঘাট পৌরসভার ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ও রেকর্ড ৫৫,৯৪,০০,২০০/- (পঞ্চান্ন কোটি চুরানব্বই লাখ দুই শত) টাকার বাজেট ঘোষণা করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন সবাইকে।
নাগরিক সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে তিনি গ্রহণ করেছেন যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আগে যেখানে জন্ম সনদ বা নাগরিকত্ব সনদ পেতে সাধারণ মানুষকে দিনের পর দিন পৌরসভার বারান্দায় ঘুরতে হতো, এখন পৌর প্রশাসকের কঠোর মনিটরিংয়ের কারণে নাগরিকত্ব, জন্ম সনদ, বিভিন্ন রকমের প্রত্যয়নপত্র ও ওয়ারিশান সনদপত্র মাত্র ১ (এক) দিনেই প্রদান করা হচ্ছে।
পৌরসভার পাশাপাশি সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে তিনি ঘোড়াঘাট ভূমি অফিসকে সম্পূর্ণ দালাল ও দুর্নীতিমুক্ত করেছেন। একসময় ভূমি অফিসে সেবার নামে যে ঘুষ বাণিজ্য চলত, তিনি তা কঠোর হস্তে বন্ধ করেছেন। বর্তমানে ঘোড়াঘাট ভূমি অফিসে কোনো প্রকার অতিরিক্ত অর্থ বা দালালের ঝামেলা ছাড়াই সরকার নির্ধারিত মাত্র ১১৭০ টাকা সরকারি ফি জমা দিয়ে মানুষ নামজারি (খারিজ) সেবা পাচ্ছেন, যা সাধারণ মানুষের কাছে একসময় ছিল অকল্পনীয় ও চরম ব্যয়বহুল। এছাড়া দীর্ঘদিনের অনিষ্পন্ন ও জটিল শত শত ভূমি মামলা আইনগত প্রক্রিয়ায় দ্রুততার সাথে নিষ্পত্তি করেছেন তিনি।
একজন দক্ষ এসিল্যান্ড হওয়ার পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তিনি মাঠেও সমান সক্রিয়। নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) পরিচালনার মাধ্যমে তিনি নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা ব্যাহত রেখেছেন। যানজট নিরসনে রাস্তার পাশে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে রাস্তা প্রশস্ত করেছেন।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে এসিল্যান্ড ও পৌর প্রশাসক মো. আব্দুল-আল-মামুন কাওসার শেখ বলেন, “আমি সরকারের একজন সেবক হিসেবে অর্পিত দায়িত্ব সততার সাথে পালনের চেষ্টা করছি মাত্র। সাধারণ মানুষ যেন কোনো হয়রানি ছাড়া তাদের প্রাপ্য অধিকার ও নাগরিক সেবা পায়, সেটাই আমার মূল লক্ষ্য। জনস্বার্থে এই উন্নয়নের ধারা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।”
সব চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষু ও অনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে দুর্মম গতিতে চলা ৩৮তম বিসিএস-এর এই কর্মকর্তার সাহসী উদ্যোগ আজ ঘোড়াঘাটের সাধারণ মানুষের মনে এক আস্থার জায়গা তৈরি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, আব্দুল-আল-মামুন কাওসার শেখের মতো কর্মনিষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রতিটি উপজেলায় থাকলে দেশের প্রশাসনিক কাঠামো যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি সাধারণ মানুষের অধিকার হবে সুসংহত।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: সাইফুল ইসলাম|
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ১৮৮, এম জে টাওয়ার (৮ম তলা), ফকিরাপুল (বড় মসজিদের পাশে) মতিঝিল, ঢাকা-১০০০। মোবাইল:- ০১৯১৯৯২০০৫৮, ০১৮১৯৯২০০৫৮, ই মেইল: gomtirbarta@gmail.com