এম কে হাসান, জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের আকাশসীমা এখন আর কেবল ত্রিপল আর বাঁশের স্তূপে সীমাবদ্ধ নেই। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে এখন মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে আধুনিক নকশার দ্বিতল ঘর। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM) ও ইউএনএইচসিআর (UNHCR)-এর তত্ত্বাবধানে নির্মিত এসব 'মিড-টার্ম শেল্টার' বা দ্বিতল ঘর নিয়ে স্থানীয় জনমনে দানা বাঁধছে গভীর সংশয় ও উদ্বেগ। প্রশ্ন উঠেছে—অস্থায়ী আশ্রয়ের নামে এই স্থায়ী অবকাঠামো কি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে চিরতরে থমকে দেওয়ার কোনো সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত?
সরেজমিন চিত্র:-
কক্সবাজারের উখিয়াধীন ৪ নম্বর এক্সটেনশন ক্যাম্পসহ বিভিন্ন ব্লকে গিয়ে দেখা যায় এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। সেখানে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে লোহার ফ্রেম, উন্নতমানের বাঁশ এবং বিশেষ ধরনের ত্রিপল ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে দ্বিতল ঘর। সরবরাহকৃত ছবিতে দেখা যায়, পাহাড়ের ঢালু জমিতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে এসব ঘর, যার নিচতলা ও ওপরতলার নকশা অনেকটা আধাপাকা ভবনের আদলে তৈরি। শুধু আবাসন নয়, ক্যাম্পের ভেতরে চলাচলের জন্য পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে প্রশস্ত রাস্তা।
সংস্থাগুলোর যুক্তি:-
দাতা সংস্থাগুলোর দাবি, এটি নিছক একটি কারিগরি সমাধান। ক্যাম্পের অসহনীয় জনঘনত্ব কমাতে এবং অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি থেকে রোহিঙ্গাদের বাঁচাতে তারা 'ভার্টিক্যাল এক্সটেনশন' বা ওপরের দিকে ঘর নির্মাণের কৌশল বেছে নিয়েছে। এর ফলে অল্প জায়গায় বেশি মানুষের সংকুলান হবে এবং চলাচলের রাস্তা বড় করা সম্ভব হবে। একে তারা সম্পূর্ণ 'মানবিক' ও 'অস্থায়ী' ব্যবস্থা হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে।
স্থানীয়দের উদ্বেগ ও বির্তক:-
তবে স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশবাদীরা একে দেখছেন ভিন্ন চোখে। তাদের মতে, একেকটি দ্বিতল ঘর নির্মাণে যে পরিমাণ ব্যয় ও প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, তা কোনোভাবেই 'অস্থায়ী' চরিত্রের সঙ্গে মেলে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, "যেখানে আমাদের লক্ষ্য রোহিঙ্গাদের দ্রুত মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো, সেখানে তাদের জন্য এভাবে বিলাসবহুল বা আধুনিক দ্বিতল ঘর বানিয়ে দেওয়া মানে তাদের এখানে স্থায়ীভাবে থেকে যেতে উৎসাহিত করা।"
পরিবেশে বিরূপ প্রভাব:-
এই নির্মাণ প্রকল্পের জন্য যত্রতত্র পাহাড় কাটা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ৪ নম্বর এক্সটেনশন ক্যাম্পে ৮ শতাধিক ঘর তৈরির জন্য বনাঞ্চল উজাড় এবং পাহাড়ের বুক চিরে প্রশস্ত রাস্তা নির্মাণের ফলে বর্ষাকালে ভয়াবহ ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মত:-
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অবকাঠামোর মান যত উন্নত হবে, প্রত্যাবাসনের দাবি তত দুর্বল হয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মানবিকতার দোহাই দিয়ে রোহিঙ্গাদের স্থায়ী জীবনযাত্রার সুযোগ করে দিচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।
কক্সবাজারের এই বিশাল শরণার্থী শিবিরের রূপান্তর এখন কেবল স্থানীয় ইস্যু নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবিকতার মোড়কে এই স্থায়ী আবাসন সুবিধা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য কোনো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: সাইফুল ইসলাম|
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ১৮৮, এম জে টাওয়ার (৮ম তলা), ফকিরাপুল (বড় মসজিদের পাশে) মতিঝিল, ঢাকা-১০০০। মোবাইল:- ০১৯১৯৯২০০৫৮, ০১৮১৯৯২০০৫৮, ই মেইল: gomtirbarta@gmail.com