রিয়াদ ইসলাম, বরগুনা জেলা
বরগুনা: ‘শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ এবং শিক্ষার আলো প্রসারে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বরগুনা সদর উপজেলার কেওড়াবুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এক বিশেষ উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। “ঝরে পড়া কমাই, শিক্ষার আলো বাড়াই” শীর্ষক এই ফোরামের আয়োজনে অংশ নেন শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকসহ মোট ৪৫ জন নাগরিক।
বুধবার (২৯ অক্টোবর, ২০২৫) বিকেলে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভায় সমাজের সর্বস্তরের মানুষ অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন নিশ্চিত করার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন।
মূল আলোচক ও আয়োজকদের ভূমিকা
অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় ছিলেন মোঃ সালমান, সাংবাদিক, দ্যা জেলখানা প্রেস নিউজ, বরগুনা।
স্বাগত বক্তব্য: সভার শুরুতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ রফিকুল ইসলাম অংশগ্রহণকারীদের ধন্যবাদ জানিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে বিদ্যালয়, পরিবার ও সমাজের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
ফোরাম পরিচিতি: ইয়ুথ ফর পলিসি (YfP) বরগুনা কমিটির টীম লিড মোঃ সোহানুর রহমান সৈকত ফোরামের ভূমিকা উপস্থাপন করেন। তিনি উপস্থিত সকলকে আইআইডি এবং ইয়ুথ ফর পলিসি (YfP) সম্পর্কে অবহিত করেন। সৈকত উল্লেখ করেন, “YfP তরুণদের নীতি নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা নিতে সক্ষম করে তোলে। বরগুনার তরুণরা শিক্ষা, লিঙ্গসমতা, জলবায়ু পরিবর্তন ও সামাজিক জবাবদিহিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করছে।”
ঝরে পড়া রোধে সমন্বিত উদ্যোগের গুরুত্ব
আলোচনায় বক্তারা শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া কমাতে পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজ—এই তিন পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা জরুরি বলে মত দেন।
শিক্ষার অর্থনৈতিক গুরুত্ব:
শিক্ষার অর্থনৈতিক দিক তুলে ধরে সহকারী শিক্ষক গোলাম বায়েজিদ এবং মোঃ সোহানুর রহমান সৈকত জানান, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া কমাতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ১-২% পর্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং জিডিপি বৃদ্ধি হতে পারে। অর্থাৎ, শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত নয়, জাতীয় উন্নয়নেরও ভিত্তি।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও প্রেরণা:
কেওড়াবুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোঃ খলিলুর রহমান নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, “শিক্ষাই আমাকে প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে থাকার শক্তি দিয়েছে। একজন শিক্ষিত মানুষ কেবল নিজের নয়, পুরো সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।”
বাল্যবিবাহের কুফল:
শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরসোসি ও রাবেয়া আক্তার সোনামণি বাল্যবিবাহের ভয়াবহ কুফল তুলে ধরেন। তাদের মতে, “১৮ বছরের আগে মেয়েদের বিয়ে না দিলে তারা পড়াশোনা শেষ করতে পারে, স্বাবলম্বী হতে পারে এবং সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে।”
আলোচনায় আরও উঠে আসে—মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে হলে শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয় এবং অল্প বয়সে গর্ভধারণের কারণে মা ও শিশু উভয়ের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে।
সমস্যা সমাধানে অংশগ্রহণকারীদের প্রস্তাবনা
উন্মুক্ত আলোচনায় সমাজের এই গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধানের জন্য অংশগ্রহণকারীরা বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপের প্রস্তাব দেন:
সচেতনতা সভা: নিয়মিত বিদ্যালয়ভিত্তিক সচেতনতা সভা আয়োজন করা।
আর্থিক সহায়তা: দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করা।
যোগাযোগ বৃদ্ধি: শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ আরও বাড়ানো।
মিডিয়ার ব্যবহার: প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে সচেতনতা প্রচার করা।
প্রশাসনের সহযোগিতা: স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় বাল্যবিবাহ কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা।
সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করলে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করা সম্ভব বলে সভায় ঐকমত্য পোষণ করা হয়।
সমাপনী বার্তা
সভার অন্তিমে প্রধান শিক্ষক মোঃ রফিকুল ইসলাম সমাপনী বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, “আজকের আলোচনার মাধ্যমে আমরা একসাথে একটি বার্তা দিতে পেরেছি—শিক্ষা কেবল বইয়ের পাঠ নয়, এটি ভবিষ্যৎ গঠনের চাবিকাঠি। সবাই যদি দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখে, তাহলে ঝরে পড়া কমানো সম্ভব।”
তিনি সকল অংশগ্রহণকারীকে ধন্যবাদ জানান এবং বরগুনা জেলাকে একটি শিক্ষাবান্ধব জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।


