এম কে হাসান, জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের শহর কক্সবাজার। দেশের পর্যটন রাজধানী হিসেবে পরিচিত এই জেলায় বর্তমানে স্থায়ী বাসিন্দা ও আশ্রয়প্রাপ্ত রোহিঙ্গা মিলিয়ে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লক্ষ মানুষের বসবাস। এর সাথে যুক্ত হয় প্রতিদিন হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক। কিন্তু বিশাল এই জনপদের জীবন যাত্রা সহজ ও ঝুঁকিমুক্ত রাখতে বর্তমান স্বাস্থ্যসেবা যথেষ্ট নয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর গাইডলাইন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কক্সবাজারের জন্য একটি বিশেষায়িত ও সমন্বিত হেলথ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন শহরে সাধারণ চিকিৎসার বাইরেও জীবন রক্ষাকারী কিছু বিশেষায়িত বিভাগ থাকা অপরিহার্য।
১. কার্ডিয়াক ও ক্যাথ ল্যাব (সময়ের লড়াই):-
পর্যটন এলাকায় হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বর্তমানে কক্সবাজার থেকে উন্নত হৃদরোগ চিকিৎসার জন্য চট্রগ্রাম বা ঢাকা দৌড়াতে হয়, যা অনেক সময় রোগীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। WHO-এর মানদণ্ড অনুযায়ী, এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যাথ ল্যাব (Cath Lab) ও সিসিইউ (CCU) থাকা বাধ্যতা মূলক, যাতে হার্ট অ্যাটাকের পর গোল্ডেন আওয়ার - এর মধ্যেই স্টেন্টিং বা এনজিওগ্রাম করা সম্ভব হয়।
২. কিডনি ডায়ালাইসিস ও নেফ্রোলজি সেন্টার:-
কক্সবাজারের বিশাল স্থায়ী জনসংখ্যার জন্য পর্যাপ্ত ডায়ালাইসিস সুবিধা নেই। এছাড়া অনেক পর্যটক কিডনি জটিলতার কারণে দীর্ঘ মেয়াদে কক্সবাজার ভ্রমণের সাহস পান না। শহরে একটি বড় আকারের আধুনিক ডায়ালাইসিস সেন্টার থাকলে স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকরা ও হলিডে ডায়ালাইসিস সুবিধা পাবেন, যা পর্যটন অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
৩. আধুনিক বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট:-
কক্সবাজারের শত শত হোটেল ও রেস্তোরাঁয় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বড় কোনো দুর্ঘটনা মোকাবিলায় এখানে বিশেষায়িত বার্ন আইসিইউ থাকা জরুরি। অগ্নিদগ্ধ রোগীদের দ্রুত প্লাস্টিক সার্জারি ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে বড় প্রাণহানির আশঙ্কা থেকে যায়।
৪. ট্রমা ও ইমার্জেন্সি রেসপন্স (এয়ার অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা):-
মেরিন ড্রাইভ বা মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনা এবং সমুদ্র সৈকতে পানিতে ডোবার মতো ঘটনা মোকাবিলায় একটি লেভেল-১ ট্রমা সেন্টার প্রয়োজন। দুর্গম পাহাড় বা গভীর সমুদ্র থেকে দ্রুত রোগী আনতে হাসপাতালের ছাদে হ্যালি প্যাড এবং এয়ার অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
৫. মহামারি নিয়ন্ত্রণ ও ট্রাভেল মেডিসিন:-
কক্সবাজারে দেশি-বিদেশি মানুষের ব্যাপক সমাগম থাকায় সংক্রামক ব্যাধি দ্রুত ছড়াতে পারে।
সারভেইল্যান্স সিস্টেম:- WHO - এর গাইডলাইন অনুযায়ী নতুন কোনো ভাইরাস বা রোগের প্রাদুর্ভাব শনাক্তে ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা।
ট্রাভেল ক্লিনিক:- বিদেশি পর্যটকদের জন্য দোভাষী ডাক্তার ও প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিনের সহজলভ্যতা।
৬. পরিবেশ ও খাদ্য নিরাপত্তা:-
পর্যটন রাজধানীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় হোটেলের বর্জ্য ও মেডিকেল বর্জ্য বৈজ্ঞানিক উপায়ে অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া রেস্তোরাঁগুলোতে 'সেফার ফুড' নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে যাতে পর্যটকরা পানিবাহিত বা খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত না হন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের অভিমত
কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের একজন সিনিয়র বিশেষজ্ঞ জানান, ৪৫-৫০ লক্ষ মানুষের এই জেলায় প্রতি ১০০০ জনের জন্য অন্তত ৩টি শয্যা থাকা প্রয়োজন। বর্তমান শয্যা সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বিশেষ করে আইসিইউ (ICU) ও এনআইসিইউ (NICU) শয্যা কয়েকগুণ বাড়ানো দরকার।
কক্সবাজার কেবল একটি শহর নয়, এটি বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ইমেজ। এখানে উন্নত মানের ক্যাথ ল্যাব, ডায়ালাইসিস সেন্টার এবং বার্ন ইউনিট সহ গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ স্থাপন করা হলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, পাহাড় ধ্বস সহ বড় ধরনের যে কোন দূর্যোগ মোকাবেলায় সক্ষম হবে এবং এটি বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে স্বীকৃত হবে। স্থানীয়দের দীর্ঘ দিনের ভোগান্তি দূর হওয়ার পাশাপাশি পর্যটকরাও পাবেন আস্থার জায়গা। নতুন সরকারের কাছে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক মানের করে গড়ে তুলতে যা যা প্রয়োজন করার আকুতি জানান সংশ্লিষ্টরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: সাইফুল ইসলাম|
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ১৮৮, এম জে টাওয়ার (৮ম তলা), ফকিরাপুল (বড় মসজিদের পাশে) মতিঝিল, ঢাকা-১০০০। মোবাইল:- ০১৯১৯৯২০০৫৮, ০১৮১৯৯২০০৫৮, ই মেইল: gomtirbarta@gmail.com