জেলা প্রতিনিধি
কক্সবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালে নবজাতকের বিশেষ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (স্ক্যানু - SCANU) থেকে তিন দিন বয়সী এক অসুস্থ নবজাতক চুরির ঘটনা ঘটেছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুর মা সেজে কৌশলে ওই শিশুটিকে কোলে নিয়ে এক অজ্ঞাতনামা বহিরাগত নারী সটকে পড়েন বলে জানা গেছে ।
ঘটনার পর হাসপাতালে তোলপাড় শুরু হলে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-৫৭৩) দায়ের করা হয় এবং গঠন করা হয় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি। তবে ঘটনার পেছনের দাপ্তরিক নথিপত্র ও ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণ করে হাসপাতালটির পরিচালনা ব্যবস্থা, নিরাপত্তা বলয় ও তদারকিতে মারাত্মক গাফিলতি ও প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনা উন্মোচিত হয়েছে।
ঘটনার সময়রেখা
হাসপাতালের প্রশাসনিক কাগজপত্র ও স্ক্যানু ওয়ার্ড সূত্রে জানা যায়, কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সমিতি পাড়ার বাসিন্দা জাহেদ আলমের স্ত্রী প্রসূতি রোজিনা আক্তার গত ৫ অক্টোবর নিজ বাড়িতে একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। শিশুটির ‘নিওনেটাল জন্ডিস’ ও নাভিতে মারাত্মক ইনফেকশন ধরা পড়লে গত ৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টায় তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের স্ক্যানু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয় (রেজিস্ট্রেশন নম্বর: ২৮৯১০/৭০)।
গত ৯ অক্টোবর রাত আনুমানিক ৯টা ৪০ মিনিটে বোরকা পরিহিত এক অজ্ঞাত নারী নিজের সন্তানকে দেখার অজুহাতে কোনো বাধা ছাড়াই স্ক্যানু ওয়ার্ডের ‘ব্রেস্টফিডিং রুমে’ প্রবেশ করে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে। রাত ১১টা ২৫ মিনিটে ওই নারী নিজেকে রোগী ‘রোজিনা আক্তার’ দাবি করে ওয়ার্ডে ঢোকে এবং দুগ্ধপানের কথা বলে শিশুটিকে কোলে নেয়। পরবর্তীতে সে শিশুটিকে নিয়ে স্ক্যানু ওয়ার্ড, স্টেপ-ডাউন এরিয়া এবং হাসপাতালের জরুরি বিভাগ অতিক্রম করে চত্বর ত্যাগ করে উধাও হয়ে যায়।
ঘটনাটি সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজে স্পষ্ট হলেও হাসপাতালে নিয়মিত সিসিটিভি মনিটরিং সিষ্টেম চালু না থাকায় চোরকে আটকানো সম্ভব হয়নি। ইতিমধ্যে রোজিনা আক্তার তার শিশুকে দুধ পান করানোর জন্য প্রবেশ করলে বিভিন্ন অজুহাতে তাকে কালক্ষেপন করান বলে জানা গেছে ভূক্তভোগীর জবান বন্দিতে । ভূক্তভোগী রোজিনা আক্তার আরো বলেন পরদিন ১০ অক্টোবর হাসপাতালের একটা ঢাকার পরিদর্শন টিম আসবে তাই তারা আমাকে কৌশলে ঘটনা প্রকাশ না করার জন্য তালবাহানা করতে থাকে । ১০ অক্টোবর ঢাকার পরিদর্শন টিম হাসপাতাল ত্যাগ করলে হাসপাতালের স্ক্যানু ওয়ার্ডের নার্স ইনচার্জ টলী ভট্টাচার্যী বিষয়টির লিখিত রিপোর্ট জমা দেন। ওয়ার্ড মাস্টার শিমুল কান্তি দে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় জিডি দায়ের করেন এবং ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. উচ্ছ্বলা মার্মা জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠির মাধ্যমে অনুলিপি জানান।
নথিপত্র বিশ্লেষণে যত অব্যবস্থাপনা স্পষ্ট:-
ম্যাচিং ট্যাগ থাকার পরও যাচাইয়ের অভাব:-
স্ক্যানু বা এনআইসিইউর মতো স্পর্শকাতর ওয়ার্ডে মা ও নবজাতকের জন্য একই বারকোড সম্বলিত ‘আইডেন্টিফিকেশন রিস্টব্যান্ড’ থাকার কথা। কিন্তু এখানে কেউ মুখে রোগীর নাম বললেই কোনো পরিচয়পত্র যাচাই না করে শিশু হস্তান্তর করা এবং চিকিৎসকে পরামর্শ ছাড়া ওয়ার্ড থেকে শিশু বের করে নিয়ে যাওয়া পুরো ঘটনাটায় অব্যবস্থাপনার চিত্র ফুটে উঠেছে ।
১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটের রহস্যজনক বিচরণ:-
অপরাধী নারী রাত ৯:৪০ থেকে ১১:২৫ মিনিট পর্যন্ত (প্রায় ১০৫ মিনিট) ব্রেস্ট ফিডিং রুম ও স্পর্শকাতর অংশে অবাধে ঘোরাঘুরি করেছে। অথচ সেখানে দায়িত্বে থাকা কোনো নার্স, সিকিউরিটি গার্ড বা কর্মী তার পরিচয় বা আগমনের কারণ জানতে চাননি।এতে করে প্রাথমিক ভাবে প্রমানিত হয় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা এই সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত।
ভিজিটর পাস ব্যবস্থার শূন্যতা:-
স্ক্যানু ওয়ার্ডে মা ছাড়া অন্য কারো প্রবেশ কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রিত তারপরও একজন বহিরাগত নারী, ‘বাচ্চা দেখার বাহানায়’ এত সহজেই প্রবেশাধিকার পেয়েছে তা প্রশ্ন থেকে যায়, যা ভিজিটর পাস ও প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা প্রমান করে।
প্রস্থান পয়েন্টে চেকিং না থাকা:-
বাচ্চা কোলে নিয়ে অপরাধী নারী স্ক্যানু ও স্টেপ-ডাউন এরিয়া পেরিয়ে প্রধান জরুরি বিভাগ দিয়ে বেরিয়ে যায়। প্রধান প্রবেশ ও প্রস্থান দ্বারে থাকা নিরাপত্তাকর্মীরা শিশু নিয়ে বের হওয়ার সময় তার কোনো গেটপাস বা ছাড়পত্র যাচাই করেননি।এটাও একটা প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরে।
অকার্যকর সিসিটিভি মনিটরিং:-
হাসপাতালে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও তা কেবল ‘ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর দেখার’ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। রিয়েল-টাইম কন্ট্রোল রুম না থাকায় প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে ঘোরাঘুরি করা সন্দেহভাজন নারীকে তাৎক্ষণিক ভাবে চিহ্নিত বা আটক করা যায়নি। এটাও একটা প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরে।
মুখ ঢেকে অবাধ যাতায়াত:-
বোরকা ও মুখ ঢাকা অবস্থায় পরিচয় নিশ্চিত না হয়ে সংবেদনশীল ওয়ার্ডে ঢুকতে দেওয়া হাসপাতালের সার্বিক নিরাপত্তাহীনতার চরম ব্যর্থতারই চিত্র তুলে ধরে।
জরুরি রেসপন্স প্রটোকলের অভাব:-
বাচ্চা নিখোঁজের তথ্য জানার পরও তাৎক্ষণিক ভাবে পুরো হাসপাতাল অবরুদ্ধ (Lockdown) করে তল্লাশি চালানোর মতো কোন তড়িৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে চুরের সিন্ডিকেট কে অবাধে স্থান ত্যাগ সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন ভূক্তভোগী পরিবার ।
তদন্ত ও প্রশাসনিক শিথিলতা:-
সহকারী পরিচালক ডা. মোহামাদুল হক স্বাক্ষরিত চিঠিতে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি ডা. মিজানুর রহমানকে প্রধান করে গঠন করা হয়েছে এবং ৩ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হলেও, ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলাকারী সিকিউরিটি বা স্টাফদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক পদক্ষেপের ঘাটতি দেখা গেছে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও তদন্ত
অসুস্থ নবজাতক চুরির ঘটনায় সহকারী পরিচালক ডা. মোহামাদুল হক স্বাক্ষরিত আদেশে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে সরেজমিনে তদন্ত করে তিন কার্যদিবসের মধ্যে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (উপ-পরিচালক) বরাবর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে বলে জানা গেছে।
কক্সবাজারের সুশীল সমাজ ও ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষের মতে, ২৪ ঘণ্টা সিকিউরিটি ও সিসিটিভি পরিবেষ্টিত একটি সরকারি জেলা সদর হাসপাতালের বিশেষায়িত (SCANU) ওয়ার্ড থেকে নবজাতক চুরি হয়ে যাওয়া চরম উদ্বেগজনক। অবিলম্বে চুরিকৃত শিশুটিকে উদ্ধার করার পাশাপাশি নিরাপত্তা কর্মীসহ দায়ী ষ্টাফদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: সাইফুল ইসলাম|
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ১৮৮, এম জে টাওয়ার (৮ম তলা), ফকিরাপুল (বড় মসজিদের পাশে) মতিঝিল, ঢাকা-১০০০। মোবাইল:- ০১৯১৯৯২০০৫৮, ০১৮১৯৯২০০৫৮, ই মেইল: gomtirbarta@gmail.com