
রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি: মো:জাহিদ হাসান
বিশ্বশান্তি রক্ষার মহান ব্রত নিয়ে সুদূর আফ্রিকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন তরুণ সেনা সদস্য শান্ত মন্ডল। কিন্তু নিয়তি তাকে ফিরিয়ে আনল কফিনে করে। সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বিদ্রোহীদের ড্রোন হামলায় শহীদ হওয়া কুড়িগ্রামের রাজারহাটের কৃতি সন্তান শান্ত মন্ডলকে (২৭) পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় নিজ গ্রামে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে।
নিথর দেহের শেষ প্রত্যাবর্তন
রবিবার (২১ ডিসেম্বর) এক হৃদয়বিদারক পরিবেশে শান্ত মন্ডল ও একই হামলায় নিহত উলিপুরের মমিনুল ইসলামের মরদেহ ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারযোগে কুড়িগ্রামের উলিপুর হেলিপ্যাডে আনা হয়। সকাল থেকেই প্রিয় সন্তান ও বীর যোদ্ধাকে এক নজর দেখার জন্য হাজারো মানুষ তীব্র শীত আর ঘন কুয়াশা উপেক্ষা করে হেলিপ্যাডে ভিড় জমান। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে দুপুর আড়াইটার দিকে মরদেহবাহী হেলিকপ্টারটি অবতরণ করলে সেখানে এক শোকাতুর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এরপর শান্তর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় রাজারহাট উপজেলার চাকিরপশার ইউনিয়নের ছাটমাধাই গ্রামে।
সামরিক মর্যাদায় জানাজা ও দাফন
বিকেলে আসরের নামাজের পর শান্ত মন্ডলের জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি চৌকস দল এই বীর সেনাকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করেন এবং বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। এরপর তাকে পারিবারিক কবরস্থানে বাবার কবরের পাশেই দাফন করা হয়। জানাজায় রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ আল ইমরান, সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ অংশ নিয়ে তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন।
স্বপ্নভঙ্গের বেদনা ও পরিবারের আর্তনাদ
নিহত শান্ত মন্ডল ছিলেন সাবেক সেনা সদস্য মৃত নুর ইসলাম মন্ডল ও সাহেরা বেগম দম্পতির কনিষ্ঠ পুত্র। ২০১৮ সালে এসএসসি পাসের পর দেশসেবার ব্রত নিয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। মাত্র দেড় মাস আগে, গত নভেম্বরে তিনি শান্তিরক্ষা মিশনে সুদানে যান। কিন্তু কে জানত, সেটাই হবে তার শেষ বিদেশ যাত্রা।
শান্তর বাড়িতে এখন কেবলই কান্নার শব্দ। তার পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী দিলরুবা খন্দকার বৃষ্টি বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। বিলাপ করতে করতে তিনি বলছিলেন, “সে তো আমাকে কথা দিয়েছিল দ্রুত ফিরে আসবে। আমাদের অনাগত সন্তানের মুখ দেখবে। এখন আমি কাকে নিয়ে থাকব? কেন সে আমাকে রেখে চলে গেল?” তার এই আহাজারিতে উপস্থিত প্রতিবেশী ও স্বজনদের চোখেও অশ্রু বাঁধ মানছিল না।
শান্তর মা সাহেরা বেগম ছোট ছেলেকে হারিয়ে পাথর হয়ে গেছেন। স্বামী নুর ইসলামের মৃত্যুর পর শান্তই ছিল তার শেষ সম্বল ও বেঁচে থাকার বড় অবলম্বন। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, “শান্ত খুব নম্র ও ভদ্র ছেলে ছিল। পুরো গ্রামের মানুষের প্রিয় ছিল সে। দেশের জন্য সে প্রাণ দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ওর মায়ের যে ক্ষতি হলো তা কোনোদিন পূরণ হবে না।”
প্রশাসনের বক্তব্য
জানাজা শেষে রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আল ইমরান শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেন, “শান্ত মন্ডল কেবল রাজারহাটের নয়, সারা দেশের গর্ব। বিদেশের মাটিতে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় তার এই আত্মত্যাগ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও জাতি চিরকাল শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই বীর সেনার পরিবারের পাশে সব সময় আছি।”
শান্ত মন্ডল চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন তার অনাগত সন্তান, বৃদ্ধা মা এবং দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ছাটমাধাই গ্রামের বাতাস আজ এক বীর যোদ্ধাকে হারানোর বেদনায় ভারী হয়ে আছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: সাইফুল ইসলাম|
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ১৮৮, এম জে টাওয়ার (৮ম তলা), ফকিরাপুল (বড় মসজিদের পাশে) মতিঝিল, ঢাকা-১০০০। মোবাইল:- ০১৯১৯৯২০০৫৮, ০১৮১৯৯২০০৫৮, ই মেইল: gomtirbarta@gmail.com