লেখক: মোছা: শিল্পী আক্তার
বিহারের এক তরুণীর কণ্ঠেবাজে মৈথিলীর সুর। সেই সুর শুধু সংগীতের সুর নয়, এক যুবশক্তির জাগরণের সুর। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই যিনি গায়িকা থেকে রাজনীতিক হয়ে উঠেছেন, তাঁর এই যাত্রাপথ রূপকথার গল্পের মতো। কিন্তু মৈথিলী ঠাকুরের এই উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি এক মানবিক সংগ্রামের ফসল, যেখানে সংস্কৃতি ও সমাজসেবার এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে।
মৈথিলীঠাকুরের জন্ম ২০০০ সালে বিহারের মধুবনীতে। সংগীতময় পরিবেশে বড় হওয়া মৈথিলীর শৈশব কেটেছে সুর-তালের মধ্যে। বাবা ও দাদার কাছেই প্রথম হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীত ও লোকসংগীতের শিক্ষা নেন তিনি। শুধু গান নয়, হারমোনিয়াম ও তবলায়ও দক্ষতা অর্জন করেন অল্প বয়সেই। এই পরিবারিক বন্ধন ও শৈল্পিক পরিবেশ তাঁর মধ্যে গড়ে তুলেছিল দৃঢ় চরিত্র ও নৈতিক মূল্যবোধ।
[সংগ্রাম ও সাফল্য]
রাইজিংস্টার, ইন্ডিয়ান আইডল জুনিয়র, সারেগামাপা লিটল চ্যাম্পসের মতো প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ মৈথিলীর জীবনে টিকে থাকার লড়াইয়ে নতুন প্রেরণা যুগিয়েছিল। শীর্ষ ৪-এ স্থান করে নেওয়া তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কিন্তু এই সাফল্য তাঁর মধ্যে অহংকার তৈরি করেনি; বরং নিয়মিত অনুশীলন ও একের পর এক গান প্রকাশ করে তিনি দর্শকদের হৃদয় জয় করেছেন। ২০২১ সালে বিহারের ঐতিহ্য সংরক্ষণে তাঁর অবদানের জন্য ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান যুব পুরস্কারপ্রাপ্তি প্রমাণ করে তাঁর কাজ শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য নয়, বরং সমাজ ও সংস্কৃতির জন্য।
মৈথিলীঠাকুরের গানগুলোতে শোনা যায় সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের গল্প। লোকসংগীতের মাধ্যমে তিনি বিহারের গ্রাম্য জীবনের রূপায়ণ করেছেন, যা শহুরে জীবনের নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে এক আলাদা অনুভূতি। ২০২০ সালে বলিউড অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পর হিন্দি চলচ্চিত্রে গান করা থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়ার সিদ্ধান্তটি তাঁর মানবিক দিকটি উন্মোচন করে। এটি শুধু পেশাগত সিদ্ধান্ত নয়, একজন সংবেদনশীল শিল্পীর হৃদয়ের টানাকেই প্রতিফলিত করে।
মৈথিলীঠাকুর আজকের যুবসমাজের জন্য এক অনুপ্রেরণাদায়ী চরিত্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ৩ কোটিরও বেশি অনুসারী শুধু তাঁর গানের জন্যই নয়, তাঁর সরলতা ও আন্তরিকতার জন্যও। ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, ইউটিউবের মাধ্যমে তিনি যুবসমাজের সঙ্গে নিয়মিত সংযোগ রাখেন, যা তরুণদের কাছে তাঁকে করে তোলে আরও বেশি বিশ্বস্ত ও গ্রহণযোগ্য।
বিহার বিধানসভানির্বাচনে বিজেপির টিকিটে বিধায়ক নির্বাচিত হয়ে মৈথিলী ঠাকুর দেখিয়েছেন, শিল্প ও রাজনীতির মেলবন্ধন সম্ভব। তাঁর এই সিদ্ধান্ত শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং সমাজসেবার এক নতুন দিগন্তের সূচনা। সংগীতের মাধ্যমে তিনি যেমন মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করেছেন, তেমনি রাজনীতির মাধ্যমে তিনি এখন সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানে কাজ করতে চান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছ থেকে ক্রিয়েটার্স অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ এবং তাঁর ‘শিবস্তোত্রম’ গানটি প্রধানমন্ত্রীকে মুগ্ধ করার ঘটনাটি মৈথিলীর সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রভাবেরই স্বীকৃতি।
মৈথিলীঠাকুরের গল্প শুধু একজন গায়িকা বা রাজনীতিকের গল্প নয়; এটি এক যুবতীর স্বপ্ন ও সংগ্রামের গল্প, যে সুর ও সেবাকে একসূত্রে গেঁথে চলেছে। তাঁর এই বহুমুখী প্রতিভা ও মানবিক আবেদন তরুণ প্রজন্মকে দেখায় যে, সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সমাজ ও দেশের সেবায় নিয়োজিত হওয়ার মধ্যেই নিহিত। মৈথিলী ঠাকুর আজ ভারতের যুবশক্তির এক জীবন্ত প্রতীক, যার শুধু শুরু হয়েছে শেষ হয়নি।
ফিচার/কলাম,
লেখক: মোছা: শিল্পী আক্তার
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর


