এম কে হাসান, জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
সৌদি আরবে অবস্থানরত ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত এবং ইতোমধ্যে প্রায় ২২ হাজার রোহিঙ্গাকে পাসপোর্ট প্রদানের বিষয়টি নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে সীমান্ত জেলা কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের। এই প্রক্রিয়ার ফলে জেলার জনতাত্বিক কাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা নিয়ে চরম সংকটের আশঙ্কা করছেন স্থানীয় ও বিশ্লষকরা।
পাসপোর্ট ইস্যু ও সৌদি রাষ্ট্রদূতের তাগিদ:- সম্প্রতি সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফর বিন আবিয়াহ সৌদি আরবে অবস্থানরত ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে দ্রুত বাংলাদেশি পাসপোর্ট ইস্যু করার তাগিদ দেন। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে ইতোমধ্যে প্রায় ২২ হাজার রোহিঙ্গাকে পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে এবং প্রক্রিয়াটি আরও ত্বরান্বিত করতে বিশেষ টিম সৌদি আরবে কাজ করছে।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পিঠ দেয়ালে ঠেকেছে :- কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরে বর্তমানে প্রায় ১৫ লক্ষের অধিক রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এর উপর সৌদি আরব থেকে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি নাগরিকত্বের দালিলিক স্বীকৃতি (পাসপোর্ট) দেওয়ার অর্থ হলো—ভবিষ্যতে তাদের একটা বড় অংশ নিজ শিকড়ে ফেরার পরিবর্তে কক্সবাজারে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ পাবে। স্থানীয় একাধিক জনপ্রতিনিধি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এমনিতেই আমরা নিজ ভূমিতে পরবাসী হওয়ার উপক্রম হয়েছি। যদি বিদেশে থাকা রোহিঙ্গারাও বাংলাদেশি পাসপোর্ট পায়, তবে এই জেলার নিয়ন্ত্রণ স্থানীয়দের হাতে থাকবে না। ইতিমধ্যে জেলার আইন শৃঙ্খলা অবনতির পিছনে রোহিঙ্গাদের দায়ী করতেছে স্থানীয়রা ।
বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে চরম সংকটের হাতছানি হিসেবে পূর্বাভাস দিচ্ছেন। তাদের মতে: পরিচয় পত্র ও পাসপোর্ট ইস্যুর বিষয়টি যথাযথ যাচাই ছাড়া চলতে থাকলে এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এতে করে মানবপাচার, আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র এবং জঙ্গি তৎপরতার ঝুঁকি আরো বাড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। পাসপোর্টধারী রোহিঙ্গারা সহজেই দেশের মূলধারায় মিশে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ায় মাদক চোরাচালান ও অপরাধ মূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জনতাত্বিক বিপর্যয়: উখিয়া টেকনাফের স্থানীয় জনগোষ্টির চেয়ে রোহিঙ্গা জনসংখ্যা কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় রাজনৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের মধ্যে ইদানিং আইন না মানার এক ধরনের মনমানসিকতা তৈরি হচ্ছে । ইতিমধ্যে শরণার্থী শিবিরে শীর্ষ সন্ত্রাসী আম্মার জুনুনী’র মুক্তির দাবীতে রোহিঙ্গারা মানব বন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে, যা কোন ভাবেই কাম্য নয় ।
সম্পদ ও জীবিকার টানাপোড়েন: সীমিত কৃষি জমি, বনভূমি ও কর্মসংস্থানের ওপর বিপুল জনসংখ্যার চাপ স্থানীয়দের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলছে।
যদিও সরকার বলছে, কেবল যাদের প্রয়োজনীয় দলিলাদি রয়েছে বা যারা বিশেষ শর্ত পূরণ করেছে তাদেরই যাচাই-বাছাই করে পাসপোর্ট দেওয়া হচ্ছে, তবুও কক্সবাজারের সাধারণ মানুষের মনে সংশয় কাটছে না। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বা পাসপোর্টের স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের জাতীয় স্বার্থ এবং সীমান্তবর্তী জেলা গুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবার আগে জরুরি।
কক্সবাজার জনপদ এখন এক অদৃশ্য আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বাইরের চাপ ও ভেতরের জনবিস্ফোরণ - উভয়ই স্থানীয়দের অস্তিত্বকে সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: সাইফুল ইসলাম|
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ১৮৮, এম জে টাওয়ার (৮ম তলা), ফকিরাপুল (বড় মসজিদের পাশে) মতিঝিল, ঢাকা-১০০০। মোবাইল:- ০১৯১৯৯২০০৫৮, ০১৮১৯৯২০০৫৮, ই মেইল: gomtirbarta@gmail.com