এম কে হাসান, জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ১৩ ই জুন শনিবার কক্সবাজার জেলায় এক সরকারি সফরে যাচ্ছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর ঐতিহ্যবাহী এই পর্যটন জেলায় এটিই তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর। দীর্ঘ দুই দশক পর সরকার প্রধানের এই আগমনকে কেন্দ্র করে জেলা জুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে কক্সবাজারের ২৯ লাখ মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অধিকার আদায়ের আন্দোলন আরও বেগবান হয়েছে। জেলা ভিত্তিক বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠন, বিশেষ করে ‘ভয়েস অব কক্সবাজার ভলান্টিয়ার্স’ এই সফরকে সামনে রেখে জেলার ৭টি জনগুরুত্বপূর্ণ ‘প্রাণের দাবি’ নিয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করছে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসার-১ মো. উজ্জ্বল হোসেন স্বাক্ষরিত চূড়ান্ত সফরসূচি অনুযায়ী, আগামী শনিবার সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা থেকে সড়ক পথে রওনা হয়ে সকাল ৯টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান যোগে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন। দিনভর এক গুচ্ছ প্রশাসনিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর রাত ১০টায় তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে কক্সবাজার ত্যাগ করবেন।
ব্যস্ততম সফরসূচিতে যা থাকছে
প্রধানমন্ত্রীর দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হলো—সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে সদর উপজেলার পিএমখালী ইউনিয়নে পাতলী খাল পুনঃখনন কাজের শুভ উদ্বোধন ও পথসভা। এরপর দুপুর ১২টায় ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন তিনি। দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এর কক্সবাজার জেলার প্রথম শহীদ মো. ওয়াসিম-এর পেকুয়াস্থ কবর জিয়ারত ও শহীদ পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন সরকার প্রধান। এরপর তিনি নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলা এবং পেকুয়া পৌরসভার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করবেন। বিকেল ৪টায় চকরিয়া পৌর বাস টার্মিনালে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সন্ধ্যায় মেরিন ড্রাইভ ও সমুদ্র সৈকত পরিদর্শন শেষে রাত ৮টায় লং বিচ হোটেল মিলনায়তনে আয়োজিত সুধী সমাবেশে স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন তিনি।
উন্নয়ন ও জননিরাপত্তায় ৭ দফা দাবি
প্রধানমন্ত্রীর এই ঐতিহাসিক আগমন উপলক্ষে কক্সবাজারের সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রার মানোন্নয়ন ও পর্যটন খাতের টেকসই বিকাশের লক্ষ্যে ‘ভয়েস অব কক্সবাজার ভলান্টিয়ার্স’ ৭টি জরুরি দাবি উত্থাপন করেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই দাবি গুলো অবহেলিত কক্সবাজারবাসীর দীর্ঘদিনের প্রাণের আকুতি।
দাবি গুলো হলো:
১. চিকিৎসা সেবার আধুনিকায়ন: জেলা সদর হাসপাতালে ৪০ শয্যা বিশিষ্ট কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার ও বার্ন ইউনিট স্থাপন সহ সিসিইউ (CCU) এবং আইসিইউ (ICU) শয্যা সংখ্যা বাড়ানো।
২. সেন্টমার্টিনে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা: সেন্টমার্টিন দ্বীপের ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে পর্যাপ্ত ডাক্তার, নার্স ও জনবল নিয়োগ এবং সার্বক্ষণিক সি-অ্যাম্বুলেন্সের (Sea-ambulance)র স্থায়ী ব্যবস্থা করা।
৩. উপকূলীয় অঞ্চলের চিকিৎসা সেবা: অবহেলিত দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী ও কুতুবদিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থায়ী ভাবে সিজারিয়ান সেকশন (C-Section) চালু করা এবং আপদ কালীন যাতায়াতের জন্য সি-অ্যাম্বুলেন্সে (Sea-ambulance)র স্থায়ী ব্যবস্থা করা।
৪. যোগাযোগ ব্যবস্থার মেগা প্রকল্প: পর্যটনের প্রসারে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ৬ লেনে উন্নীত করণের কাজ নিশ্চিত করা।
৫. আইন শৃঙ্খলা রক্ষা: টেকনাফ উপজেলা এবং ইদগড় সড়কে নিয়মিত অপহরণ, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও মাদক চোরাচালান বন্ধে স্থায়ী ও কঠোর নিরাপত্তা জোরদার করা এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা ।
৬. পর্যটকদের জীবন ও সৈকত নিরাপত্তা: সমুদ্র সৈকতে গোসল করতে নেমে পর্যটকদের অকাল মৃত্যু রোধে দ্রুত ‘সী-নেটিং’ (Sea-netting) স্থাপন এবং পর্যাপ্ত দক্ষ লাইফ গার্ড নিয়োগ দেওয়া এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো সক্রিয় করা ।
৭. পর্যটন শহরের যানজট নিরসন: কক্সবাজার শহর থেকে থ্রি-হুইলার, ব্যাটারি চালিত রিকশা, লাইসেন্স বিহীন ও অবৈধ যানবাহন ( টমটম, মিশুক, সিএনজি, জীপ, ড্রামট্রাক ও মোটর সাইকেল) সহ অপসারণ করে ফুটপাত দখল মুক্ত করা এবং স্থানীয় ও পর্যটকদের স্বস্তি দায়ক যাতায়াত নিশ্চিত করা।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে পুরো কক্সবাজার জেলায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। জেলা শহর থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।
স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তৃণমূলের মানুষের সুশাসন ও অধিকার নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবের অন্যতম বীর শহীদ ওয়াসিমের কবর জিয়ারত এবং মাতামুহুরী উপজেলার মতো নতুন প্রশাসনিক অঞ্চলের ঘোষণা এই জনপদের প্রতি তাঁর বিশেষ নজরদারির প্রমাণ। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, শুধু আনুষ্ঠানিক সফর নয়, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট এই ৭টি প্রাণের দাবি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে প্রকৃত অর্থেই আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক জনপদ হিসেবে গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেবেন প্রধানমন্ত্রী।


