আজিজুল গাজী জেলা প্রতিনিধি, বাগেরহাট।
বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও লোকজ জীবনের হারিয়ে যেতে বসা স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে নতুন করে তুলে ধরার এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বাগেরহাট জেলার শাহ আউলিয়ারবাগ মল্লিক মহসিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়েছে হারিয়ে যাওয়া দেশজ সংস্কৃতি প্রদর্শন ও পিঠা উৎসব, যা রীতিমতো এক বিশাল ছাত্র–শিক্ষক–অভিভাবক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক মল্লিক শামিম আক্তার–এর সার্বিক দিকনির্দেশনা এবং বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষকের আন্তরিক সহযোগিতায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠান শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। দিনব্যাপী এই আয়োজনে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণজুড়ে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ।
উৎসবে মোট পাঁচটি স্টল স্থাপন করা হয়। প্রতিটি স্টলের দায়িত্বে ছিলেন একজন শিক্ষক, একজন অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের একটি দল। এই ব্যতিক্রমী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শিক্ষক–অভিভাবক–শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।
স্টলগুলোতে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী পিঠা যেমন—চিতই, পাটিসাপটা, ভাপা, দুধচিতা, পুলি পিঠা, নকশি পিঠাসহ বিভিন্ন লোকজ খাবার প্রদর্শন ও পরিবেশন করা হয়। পাশাপাশি পুরনো দিনের কৃষি উপকরণ, গ্রামীণ আসবাবপত্র, লোকজ সামগ্রী এবং বাংলার সংস্কৃতির নানা উপাদান প্রদর্শিত হয়, যা দর্শনার্থীদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করে।
অনুষ্ঠানের আয়োজনের পেছনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক মল্লিক শামিম আক্তার বলেন—
“বর্তমান সময়ে বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের গ্রাম বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ বাংলার সংস্কৃতির রয়েছে এক গৌরবময় ইতিহাস। নতুন প্রজন্মকে সেই ইতিহাস ও শিকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেই আমরা এই ধরনের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্মিলিত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য।”
অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন শাহ আউলিয়ারবাগ মল্লিক মহসিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক মল্লিক হাবিবুর রহমান। তিনি তার বক্তব্যে বলেন—
“শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য এ ধরনের আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের এই উৎসব শিক্ষার্থীদের নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করবে।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যালয়ের প্রাক্তন সভাপতি আলহাজ্ব মাওলানা আবু বক্কর সিদ্দিক। তিনি বলেন
“এমন আয়োজন আজকাল খুবই বিরল। গ্রাম বাংলার সংস্কৃতিকে নতুন করে জাগ্রত করার জন্য বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।”
আরেক প্রাক্তন সভাপতি আলহাজ্ব খান আলী আকবার তার বক্তব্যে বলেন
“এই অনুষ্ঠান শুধু একটি বিদ্যালয়ের নয়, পুরো এলাকার মানুষের জন্য গর্বের বিষয়। ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত হওয়া প্রয়োজন।”
পিলজংগ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সরদার বিল্লাল হোসেন বলেন
“শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক চর্চা শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই আয়োজন শিক্ষার্থীদের অপসংস্কৃতি থেকে দূরে রাখতে সহায়ক হবে।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সরজিত কুমার দাস বলেন
“শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক মনন গঠনে আমরা সর্বদা সচেষ্ট। এই আয়োজন তারই একটি উদাহরণ।”
অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল পুরনো দিনের গান, লোকসংগীত ও নৃত্য পরিবেশনা। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের মাঝে সেই পুরনো দিনের সুর ও নাচ দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে তোলে। শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় ফুটে ওঠে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির প্রাণ।
দিনভর চলা এই আয়োজনে হাজার হাজার মানুষের মিলনমেলা ঘটে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষক সমাজ, সামাজিক নেতৃবৃন্দ এবং জাতির বিবেকখ্যাত সাংবাদিকরা। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে পুরো আয়োজনটি কাভার করেন।
সবশেষে উৎসবটি আনন্দঘন পরিবেশে সফলভাবে সমাপ্ত হয়। এমন ব্যতিক্রমী ও শিক্ষামূলক আয়োজন ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও উপস্থিত অতিথিবৃন্দ।


