উমংনু মারমা, বান্দরবান প্রতিনিধি,
বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার করুকপাতা ইউনিয়নে বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এতে করে পুরো ইউনিয়নজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এই সময়ে জুমের ভরা মৌসুমে হামের প্রভাবে কারণে অন্তত ৩৭৫ পরিবার নিয়মিত জুমচাষ করতে পারছেন না। ফলে খাদ্য সংকটে পড়ার আশঙ্কা করছেন ঐ এলাকা বাসিন্দরা।
জানা গেছে, করুকপাতা ইউনিয়নটি প্রায় ১৩ হাজার ম্রো, ত্রিপুরা, মার্মা জনগোষ্ঠীর বসবাসের এলাকা, যাদের প্রধান জীবিকা জুমচাষ। তবে হামের প্রভাবে চলমান জুমচাষ মৌসুমে চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অন্তত ৩৭৫ টি পরিবার নিয়মিত জুমচাষ করতে পারছে না, ফলে খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দিতে পারে বলে তাদের ধারণা।
আজ বৃহস্পতিবার সর্বশেষ।আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য মতে, এই পর্যন্ত হামের উপর্সগ নিয়ে বিভিন্নভাবে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৭৫ জন। তাদের মধ্যে ২৬৫ জনকে ছাড়পত্র দিয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে হামের রোগি ও অন্যান্য রোগী ৬৯ জন ভর্তি রয়েছে। তবে হামের উপর্সগ নিয়ে এ পর্যন্ত ৭ জন মারা গেছেন বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয় জুমচাষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আক্রান্ত পরিবারগুলোর প্রায় প্রতিটিতেই কেউ না কেউ হামের উপসর্গে ভুগছেন। অসুস্থ সন্তানদের নিয়ে পরিবারের সদস্যরা আলীকদম, লামা ও কক্সবাজারের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে ব্যস্ত থাকায় মাঠে কাজ করার মতো পরিস্থিতি নেই। ফলে অর্থকরী ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে খাদ্য সংকট ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
দড়ি পাড়ার বাসিন্দা মাংইন ম্রো বলেন, হাম রোগের কারণে জুমের কাজে যেতে পারছেন না। এ বছর জুমচাষ করতে না পারলে খাদ্য সংকটে পড়তে হবে। জুমের কাজ করার মতো মানুষ নেই। বেশিরভাগই হাসপাতালে। আমাদের হাতে টাকা-পয়সাও নেই, দিনমজুরও পাওয়া যাচ্ছে না।
একই অবস্থা তুলে ধরেন আরেক বাসিন্দা সূর্য ম্রো। তিনি বলেন, জুমচাষ ঠিকমতো করতে পারিনি। যাদের বাড়িতে রোগী আছে, তারা কেউই জুমে যেতে পারেনি। মা-বাবাদের সন্তানদের নিয়ে হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে, জুমচাষ করবে কিভাবে।
বড় আগলা পাড়ার মেনয়ুং ম্রো বলেন, তার পরিবারে নয়জন সদস্য, যাদের বেশিরভাগই অসুস্থ। আমার বাবাও অসুস্থ, চলাফেরা করতে পারেন না। স্ত্রী ও তিন সন্তান, ছোট ভাই, বাচ্চারাও হাম রোগে আক্রান্ত। অসুস্থদের দেখভাল করতে গিয়ে আমাদের হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে। ফলে জুমচাষ ঠিকমতো করতে পারিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা দুনিরাং ত্রিপুরা বলেন, ছেলে-মেয়েদের হাসপাতালে নিতে হয়েছে, তাই জুমের কাজ করতে পারিনি। এখন অবস্থা খুব খারাপ। আমরা সবাই অসহায় হয়ে পড়েছি। জুমচাষ করতে না পারলে খাবার পাবো না।
করুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্রাপ্রো ম্রো বলেন, তার ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল। হাম রোগে আক্রান্ত পরিবারগুলো ঠিকমতো জুমচাষ করতে পারেনি। ফলে তারা ভবিষ্যতে খাদ্য সংকটে পড়বে।
তিনি আরও বলেন, যেসব পরিবার হাম রোগে আক্রান্ত হয়েছে, তারা ইতোমধ্যেই ঝুঁকিতে রয়েছে। উপজেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসন যদি আক্রান্তদের তালিকা করে সহায়তা দেওয়া হয়, তাহলে কিছুটা হলেও তারা এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে।
বান্দরবান জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু নঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলেন, সময়মতো জুমচাষ করতে না পারলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। জুমচাষ সম্পূর্ণভাবে আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল, তাই নির্ধারিত সময়ে বপন ও নিয়মিত পরিচর্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, জুমচাষে নির্দিষ্ট সময়ে বীজ রোপণ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়, কিন্তু বিলম্ব হলে উৎপাদন কমে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে পরবর্তী ফসলের পরিকল্পনা করতে হবে। বর্তমানে বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ায় জুমচাষের জন্য উপযুক্ত সময়। হাম রোগে আক্রান্ত এলাকায় বেশিদিন থাকবে না। পরিবারের অন্য সদস্যরা চাইলে জুমের কাজ এগিয়ে নিতে পারেন। প্রয়োজনে অন্য কাউকে দিয়ে কাজ করালেও বড় কোনো সমস্যা হবে না।
এ বিষয়ে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম জানান, করুকপাতা ইউনিয়নের প্রায় ৩২২টি পরিবারে হামের উপসর্গে কেউ না কেউ আক্রান্ত হয়েছেন। রোগীর সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের হাসপাতালে অবস্থান করতে হওয়ায় তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম, বিশেষ করে জুমচাষ ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিষয়টি জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় সংসদ সদস্যকে অবহিত করা হবে। সরকারি বিভিন্ন বরাদ্দের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেওয়া হবে।


