কাশেম হাওলাদার, বরগুনা:
বরগুনার আমতলী উপজেলায় ভিজিডি (ভালনারেবল উইমেন বেনিফিশিয়ারি) কার্ডের তালিকা প্রণয়নে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। ৬৫.৭০ মেট্রিক টন খাদ্য বরাদ্দের বিপরীতে এক হাজার একশত সত্তরটি ভিজিডি কার্ডের তালিকা তৈরিতে প্রকৃত দুস্থ ও অসহায় নারীরা বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের পরিবর্তে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বিত্তবান ও প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যদের নাম।
জানা গেছে, উপজেলার গুলিশাখালী ৩৭২, আঠারোগাছিয়া ৩০৪, চাওড়া ২৭৮, হলদিয়া ৩৮৮, আমতলী সদর ৩২৬, কুকুয়া ৩১৩ ও আড়পাঙ্গাশিয়া ১৮৮ পরিবারের জন্য কার্ড বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ইউনিয়নেই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আবেদনপত্র পূরণের অজুহাতে জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই পরিবারপ্রতি তিনশ’ টাকা করে হাতিয়ে নিয়েছেন। এছাড়াও আর্থিক লেনদেন ও প্রভাব খাটিয়ে স্বচ্ছল পরিবারের সদস্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আমতলীর প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নের তালিকায় দুর্নীতি ও অনিয়মের ছাপ স্পষ্ট। অনেক সচ্ছল পরিবারের নাম তালিকায় এসেছে, অথচ প্রকৃত হতদরিদ্ররা বঞ্চিত।
ভিজিডি কর্মসূচি গ্রামীণ দুস্থ নারীদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। দুই বছর মেয়াদী এ কর্মসূচির আওতায় প্রতি মাসে উপকারভোগীরা খাদ্যসহায়তা পান। কিন্তু অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে কর্মসূচির উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
চাওড়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. হারুন অর রশিদ বলেন, আমাদের ইউনিয়নে ২৭৮টি পরিবারের জন্য কার্ড বরাদ্দ ছিল। চেয়ারম্যান ১৫৮টি পরিবারের তালিকা নিজে করেছেন, বাকি ১২০টি সদস্যদের দিয়েছেন। যাচাই-বাছাইয়ের পুরো কাজ করেছেন চেয়ারম্যান ও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা। দুর্নীতি হয়েছে কিনা, তা আমরা নিশ্চিত নই।
চাওড়া ইউনিয়নের চন্দ্রা গ্রামের হতদরিদ্র রুস্তম আলীর স্ত্রী আলেয়া বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা দিন আনি দিন খাই, আবেদন করেও কার্ড পাইনি কারণ টাকা দিতে পারিনি। অথচ ধনীদের কার্ড হয়েছে।
একই ইউনিয়নের পাতাকাটা গ্রামের জাকিয়া বেগম বলেন, আমরা নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থায় দিন কাটাই। অথচ অর্থের বিনিময়ে বিত্তবানদের নাম তালিকায় উঠেছে, আমরা বঞ্চিত।
আমতলী উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তালিকাভুক্তির সময় কিছু অনিয়ম হতে পারে। ইতোমধ্যে অনেক প্রকৃত অসহায় নারী আমাদের অফিসে এসেছেন, কিন্তু চূড়ান্ত তালিকা সংশোধনের ক্ষমতা আমাদের নেই।
আড়পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য রোজিনা বলেন, চেয়ারম্যান সোহেলী পারভীন মালা ভিজিডি বাছাই নিজেই করেছেন। আমরা প্রত্যেকে মাত্র আটটি পরিবারের তালিকা দিতে পেরেছি, বাকি কার্ডগুলো তিনি নিজের মতো করে বণ্টন করেছেন এবং টাকার বিনিময়ে স্বচ্ছল পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
গুলিশাখালী ইউনিয়নের এক ইউপি সদস্য বলেন, তালিকা তৈরির অনিয়মে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও নতুন করে প্রকৃত দুস্থদের তালিকা করা জরুরি। মেম্বারদের মতামত ছাড়াই অফিসের প্রতিনিধিরা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তালিকা করেছেন।
এ বিষয়ে আমতলী মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা রূপ কুমার পালের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রোকনুজ্জামান খান বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


