এম কে হাসান, জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
পর্যটন নগরী কক্সবাজারের নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন, পৌরসেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি বাসযোগ্য ও পর্যটনবান্ধব নগর গড়ে তোলার লক্ষ্যে নাগরিক প্রতিনিধি ও পৌর কর্তৃপক্ষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘নাগরিক-পৌরসভা সংলাপ’।
সোমবার সকালে কক্সবাজার পৌরসভা সম্মেলন কক্ষে জানার অধিকার, জবাবের দায়: পর্যটনবান্ধব ও বাসযোগ্য কক্সবাজার গড়তে নাগরিক-পৌরসভা সংলাপ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস বাংলাদেশ (রিইব)।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট ছড়াকার ও সাবেক মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নাছির উদ্দিন। সঞ্চালনা করেন রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস বাংলাদেশ (রিইব)‘র ডেপুটি ডিরেক্টর রুহি নাজ।
সংলাপে বক্তারা বলেন, পর্যটনের প্রসার, দ্রুত নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে কক্সবাজার পৌরসভার ওপর নাগরিক সেবার চাপ দিন দিন বাড়ছে। এর সঙ্গে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের উপস্থিতি বাজারব্যবস্থা, সুপেয় পানির উৎস এবং নগর ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।
বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ রাশেদ মো. আলী বলেন, তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ শুধু তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করে না; এটি সেবাদাতা ও সেবাগ্রহীতার মধ্যে আস্থা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও প্রতিষ্ঠা করে। স্থানীয় পর্যায়ে আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম হাসান বলেন, ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন পৌরসেবা গ্রহণে ব্যবসায়ীরা নানা ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হন। তথ্য অধিকার আইনের যথাযথ প্রয়োগ হলে এসব সেবায় স্বচ্ছতা ও গতি বাড়বে।
বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট রাবেয়া সুলতানা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণে বিদ্যমান সমস্যা এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের বিভিন্ন অসঙ্গতির বিষয় তুলে ধরেন। তিনি পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেন।
অ্যাক্টিভিস্ট ও সমাজকর্মী মো. কামরুল হাসান নগরীর যানজট নিরসনে অবৈধ মিশুক, টমটম ও সিএনজিচালিত যানবাহনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ হকারদের পুনর্বাসনের জন্য পৃথক হকার মার্কেট নির্মাণ এবং ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার প্রস্তাব দেন।
সমাজকর্মী ও অ্যাক্টিভিস্ট জাকির হোসেন নয়ন পৌরসভার বিভিন্ন নাগরিক সেবা নির্ধারিত সময়ে না পাওয়া এবং সেবাপ্রদানে বিদ্যমান অসঙ্গতির বিষয় তুলে ধরে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
সংলাপে সুপেয় পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং ফুটপাত দখলমুক্তকরণ—এই চারটি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আলোচনা হয়।
সুপেয় পানির ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়া এবং সরবরাহ সংকটের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। নিরাপদ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানান বক্তারা।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী বর্জ্য সংগ্রহ, আধুনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্ট স্থাপন এবং স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
যানজট প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, নগরীতে প্রায় ১০ হাজারের বেশি লাইসেন্সবিহীন মিশুক, অটোরিকশা ও টমটম চলাচল করছে। এ সমস্যা সমাধানে ডিজিটাল ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং পর্যটকদের জন্য পৃথক পার্কিং জোন গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি হকারদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
রিইবের ডেপুটি ডিরেক্টর রুহি নাজ বলেন, তথ্য অধিকার আইনের কার্যকর প্রয়োগ স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম ভিত্তি। নাগরিকদের সঙ্গে সরাসরি সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার বাস্তব চিত্র উঠে আসে এবং সমাধানের পথও সহজ হয়।
তিনি জানান, ‘অ্যাডভান্সিং অ্যাকাউন্টেবিলিটি অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সি থ্রু দ্য রাইট টু ইনফরমেশন’ প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজার সদর উপজেলায় রিইবের ৩৫ জন সদস্য তথ্য অধিকার আইন বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছেন।
সংলাপের শেষে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত গুলোতে নির্দিষ্ট সময়সীমাসহ লিখিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়ন এবং নাগরিক অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির জন্য একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বক্তারা বলেন, নাগরিক অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিমূলক সুশাসনের মাধ্যমেই কক্সবাজারকে একটি পরিচ্ছন্ন, আধুনিক, বাসযোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।


