উমংনু মারমা, বান্দরবান, প্রতিনিধি।
টানা চার দিনের মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ এবং পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের প্রধান দুই নদী সাঙ্গু ও মাতামুহুরীর পানি দ্রুত বেড়ে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। এতে জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলার সাত উপজেলায় ২২০টি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে পাহাড়ধস ও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনায় জনদুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবান সদর উপজেলায় ৪৬টি, রুমায় ২৮টি, রোয়াংছড়িতে ১৯টি, থানচিতে ১৫টি, আলীকদমে ১৫টি, লামায় ৫৫টি এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
আজ বুধবার সকালে সরেজমিনে বান্দরবান পৌর এলাকার হাফেজঘোনা, কালাঘাটা, ক্যংচিংঘাটা, বালাঘাটা, বরিলালপাড়া, মারমা বাজার নদীপাড়, কাশেমপাড়া ও মেম্বারপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কোথাও কোথাও কোমর থেকে গলা সমান পানি জমেছে। এতে হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছেন। কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে, কেউ আবার আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকে উঁচু সড়কের পাশে অস্থায়ী ঝুপড়ি তৈরি করে বসবাস শুরু করেছেন।
মারমা বাজার নদীপাড় এলাকার বাসিন্দা শিল্পী রানী দাশ বলেন, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে হঠাৎ করেই পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। বিদ্যুৎ না থাকায় প্রয়োজনীয় মালামাল সরিয়ে নিতে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। বড় আসবাবপত্র বের করা সম্ভব হয়নি। এখন আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
একই এলাকার বাসিন্দা আ উ মারমা ও য়ইনসাসহ কয়েকজন জানান, ঘরের ভারী আসবাবপত্র ফেলে রেখে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে মন সায় দিচ্ছে না। তাই তাঁরা সড়কের পাশে অস্থায়ী ঝুপড়ি তৈরি করে অবস্থান নিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাতে কিছু মোমবাতি দেওয়া হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বান্দরবান কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী অপু দেব বলেন, মাতামুহুরী নদীর বিপৎসীমা ১১ দশমিক ৮০ মিটার হলেও বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত পানির উচ্চতা ছিল ১১ দশমিক ৯৪ মিটার। একই সময়ে সাঙ্গু নদীর বিপৎসীমা ১৪ দশমিক ৮০ মিটার অতিক্রম করে পানির উচ্চতা দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৯০ মিটারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের বান্দরবান কার্যালয়ের অফিসার ইনচার্জ সনাতন কুমার মণ্ডল বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় (৮ জুলাই সকাল ৯টা পর্যন্ত) জেলায় ৩০৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা অতিভারী বর্ষণ হিসেবে বিবেচিত।
এদিকে মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে পৌর এলাকার কালাঘাটা বড়ুয়া টেক এলাকায় পাহাড়ধসে অন্তত পাঁচ থেকে ছয়টি বসতঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। তবে ঘটনার সময় ঘরগুলোতে কেউ না থাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
অবিরাম বৃষ্টিতে বিভিন্ন ঝিরি ও ঝর্ণার পানি বেড়ে সড়কের ওপর উঠে আসায় বান্দরবান সদর–আলীকদম এবং বান্দরবান সদর–রোয়াংছড়ি সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে সাধারণ যাত্রী ও জরুরি সেবাগ্রহীতারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পাহাড়ধস ও বন্যার ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জনপ্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মাইকিং করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে সতর্ক করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, নদীতীর ও পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় জেলার সাত উপজেলায় ২২০টি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যে অনেক পরিবার সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষের জন্য শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন কাজ করছে।


