জেলা প্রতিনিধি বান্দরবানঃ
বান্দরবান সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডের একটি বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে হামের সঙ্গে লড়ছে চার বছরের ডনওয়াই ম্রো ও দুই বছরের কাইংওয়াই ম্রো। তারা এখনো জানে না, তাদের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়—মা লেংরুম ম্রো—আর বেঁচে নেই।
রুমা উপজেলার গ্যালেঙ্গ্যা ইউনিয়নের দুর্গম চিনিপাড়ার এই পরিবারের ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের শোকগাথা নয়; এটি পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা, দারিদ্র্য, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় পৌঁছানোর সীমাবদ্ধতার একটি নির্মম বাস্তবচিত্র।
হাসপাতাল ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে হামে আক্রান্ত দুই সন্তানকে নিয়ে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ভর্তি হন ক্রংসং ম্রো ও তার স্ত্রী লেংরুম ম্রো। সন্তানদের দিন-রাত সেবা করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন লেংরুম। অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেন।
কিন্তু পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা, চট্টগ্রামে যাওয়ার ব্যয় বহনের অক্ষমতা এবং বাংলা ভাষায় যোগাযোগ করতে না পারার কারণে স্বামী সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। পরিবর্তে গ্রামের কবিরাজের চিকিৎসার আশায় স্ত্রীকে বাড়িতে নিয়ে যান। ২৯ জুলাই সন্ধ্যায় বাড়ি পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরই লেংরুম ম্রো মারা যান।
এদিকে দুই শিশু তখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। পরিবারের সদস্যরা শিশুদের কাছে মায়ের মৃত্যুর খবর গোপন রেখেছেন। বর্তমানে তাদের দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়েছেন ১৯ বছর বয়সী কাকা ক্রংতন ম্রো ও মামা পায়াং ম্রো।
ক্রংতন ম্রো বলেন, “আমার দাদা নিরক্ষর। বাংলা ভাষাও ভালোভাবে বলতে পারেন না। হাতে কোনো টাকা ছিল না। চিকিৎসকরা চট্টগ্রামে নিতে বললেও সেখানে অনেক খরচ হবে ভেবে তিনি সাহস পাননি। তাই বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভাবিকে আর বাঁচানো গেল না।”
তিনি জানান, তাদের গ্রামের অধিকাংশ মানুষ জীবনে প্রথমবারের মতো হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতার অভাবের কারণে অনেক রোগী সময়মতো চিকিৎসা পান না।
এদিকে রুমা উপজেলার বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে উপজেলায় একাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে সরকারি ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে মৃত্যুর সংখ্যায় কিছু পার্থক্য রয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা ও টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের কথা জানিয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্গম অঞ্চলে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, শতভাগ হাম টিকাদান, মাতৃভাষাভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা, জরুরি রোগী পরিবহন এবং দরিদ্র পরিবারের জন্য চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে এমন মর্মান্তিক ঘটনা পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকেই যাবে।


