জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
কক্সবাজারের প্রান্তিক ও দুর্গম অঞ্চলের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সেবা, মাতৃ স্বাস্থ্য, প্রসূতি কল্যাণ এবং পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের প্রধান আশ্রয়স্থল ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। কিন্তু চিকিৎসক ও জনবলের তীব্র সংকটে জেলার এই প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা কাঠামো এখন প্রায় অচল। জেলায় অনুমোদিত ৪৯টি কেন্দ্রের একটিতেও কোনো মেডিকেল অফিসার কর্মরত নেই। মূল চিকিৎসকের পদ ১০০% খালি থাকার পাশাপাশি উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ও পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা (FWV) পদে চরম শূন্যতায় স্তব্ধ হয়ে পড়েছে মাঠপর্যায়ের সেবা।
পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের দাপ্তরিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুরো জেলার ৪৯টি সেবা কেন্দ্রে অনুমোদিত পদের বিপরীতে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (SACMO) কর্মরত আছেন মাত্র ৩ জন এবং পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা (FWV) রয়েছেন ৩৬ জন। মোট অনুমোদিত জনবলের প্রায় ৭২ শতাংশ পদই শূন্য, আর কর্মরত আছেন মাত্র ২৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় জনবলের তুলনায় শূন্য পদের সংখ্যা প্রায় ১.৫ গুণেরও বেশি।
উপজেলা ভিত্তিক সংকটের সার্বিক চিত্র:-
• দ্বীপ ও দুর্গম এলাকা (কুতুবদিয়া ও মহেশখালী): কুতুবদিয়ার ৫টি কেন্দ্রের (আলী আকবর ডেইল, লেমশীখালী, উত্তর ধুরং, কৈয়ারবিল ও দক্ষিণ ধুরং) কোনোটিতেই ডাক্তার বা SACMO নেই, মাত্র ২টি কেন্দ্রে ১ জন করে FWV রয়েছেন। মহেশখালীর ৬টি কেন্দ্রের কোনোটিতেই চিকিৎসক বা উপ-সহকারী কর্মকর্তা নেই, মাত্র ৩ জন পরিদর্শিকা দিয়ে খুঁড়িয়ে চলছে কার্যক্রম।
• চকরিয়া ও পেকুয়া: চকরিয়া ১৫টি কেন্দ্রের কোনোটিতে মেডিকেল অফিসার বা SACMO নেই, কাজ চালাচ্ছেন ১২ জন পরিদর্শিকা। পেকুয়ার ৫টি কেন্দ্রেও ডাক্তার ও SACMO শূন্য, কর্মরত আছেন ৪ জন FWV।
• সদর, রামু ও উখিয়া: সদরের ৫টি কেন্দ্রের মধ্যে কেবল খুরুশকুলে এবং রামুর ৭টি কেন্দ্রের মধ্যে কেবল ঈদগড়ে ১ জন করে SACMO রয়েছেন। উখিয়ার ৩টি কেন্দ্রে কোনো ডাক্তার বা SACMO নেই, কর্মরত আছেন ২ জন FWV।
• টেকনাফ: সীমান্ত উপজেলা টেকনাফের ৩টি কেন্দ্রের মধ্যে কেবল সাবরাং কেন্দ্রে ১ জন SACMO ও ১ জন FWV রয়েছেন। অন্য দুটি কেন্দ্রে FWV-রাই একমাত্র ভরসা।
কাগজে ২৮%, বাস্তবে ভিন্ন চিত্র
কক্সবাজার জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপ-পরিচালক বিপ্লব বড়ুয়া স্বাক্ষরিত সরকারি নথি থেকে এসব তথ্য জানা গেলেও, বাস্তব চিত্র আরও করুণ। স্থানীয়দের অভিযোগে জানা যায়, কাগজে-কলমে যে ২৮ শতাংশ জনবল কর্মরত দেখানো হচ্ছে, তার বড় একটি অংশ প্রায়শই দাপ্তরিক প্রশিক্ষণ, মিটিং ও বিভিন্ন সরকারি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনে কেন্দ্রের বাইরে থাকেন। ফলে সপ্তাহের অধিকাংশ দিন এসব কেন্দ্রে এসে পর্যাপ্ত সেবা না পেয়ে ফেরত যাচ্ছে স্থানীয় জনগন । প্রসূতি কিংবা অসুস্থ শিশুদের নিয়ে মাইলের পর মাইল পথ হেঁটে এসে খালি হাতে ফিরে যেতে হয় ভূক্তভোগীদের।
জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি ও সেবায় ধস:-
• অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও মাতৃত্ব কালীন ঝুঁকি: ইউনিয়ন কেন্দ্র গুলো থেকে নিয়মিত পরিবার পরিকল্পনার উপকরণ (খাবার বড়ি, কনডম, ইনজেকশন, আইইউডি ইত্যাদি) এবং পরামর্শ দেওয়া হয়। দক্ষ জনবলের অভাবে মাঠ পর্যায়ে এ সব সেবার সরবরাহ শ্লথ হয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, অনিরাপদ গর্ভপাত ও অপ্রাপ্ত বয়সে মা হওয়ার ঝুঁকি মারাত্মক ভাবে বাড়ছে।
• নিরাপদ প্রসূতি সেবার অভাব ও মাতৃত্ব কালীন জটিলতা: প্রাথমিক ধাপে গর্ভকালীন (ANC) সেবা ও প্রসব-পরবর্তী (PNC) সেবা ও পরীক্ষা বন্ধ থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণ সময়মতো শনাক্ত করা যাচ্ছে না। ফলে প্রসূতিদের দূরবর্তী হাসপাতালে স্থানান্তর করতে গিয়ে বিলম্ব হচ্ছে, যা মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
• শিশু স্বাস্থ্য ও পুষ্টি কার্যক্রম ব্যাহত: টিকাদান তদারকি ও শিশুর প্রারম্ভিক চিকিৎসা থমকে থাকায় সাধারণ ডায়রিয়া বা শ্বাসকষ্টের চিকিৎসাও মিলছে না এসব কেন্দ্র গুলোতে।
• অপচিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য ও আর্থ-সামাজিক বোঝা: বাধ্য হয়ে প্রসূতি ও দরিদ্র পরিবার গুলো স্থানীয় ভুয়া চিকিৎসক (কোয়াক) বা ওষুধের দোকানের ওপর নির্ভর হয়ে পড়ছে, যা বিপুল আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি জীবনঘাতী ঝুঁকি তৈরি করছে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলার পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপ-পরিচালক বিপ্লব বড়ুয়া বলেন, চিকিৎসক ও জনবল সংকটের বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিত ভাবে জানিয়েছি। প্রত্যন্ত এলাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যাতে মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য বিদ্যমান সীমিত জনবল দিয়েই বিকল্প উপায়ে সেবা চালু রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। দ্রুত নতুন পদায়ন ও নিয়োগ হলে এ সংকটের নিরসন হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতামত:
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও মানব অধিকার কর্মীদের মতে, কক্সবাজারের মতো দুর্যোগ প্রবণ ও ভৌগোলিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে প্রাথমিক স্বাস্থ্য কাঠামো ভেঙে পড়ার এটা এক ভয়াবহ সংকেত।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ও স্থানীয় স্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা আন্দোলনের প্রতিনিধিরা জানান, কাগজে ২৮ শতাংশ কর্মী দেখালেও ট্রেনিং ও অন্যান্য ডিউটির কারণে বাস্তবে কেন্দ্র গুলোতে প্রায় সময় সরকারি দায়িত্বশীল কাউকেই পাওয়া যায় না। প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র নারীরা সরাসরি এই অবহেলার শিকার হচ্ছেন। জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসক পদায়ন এবং শূন্য পদ গুলো দ্রুত পূরণ না করা হলে এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় রোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।


