জেলা প্রতিনিধি,কক্সবাজার
বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার। পর্যটন নগরীর সৌন্দর্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্ট সংলগ্ন এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে নতুন সড়ক। প্রায় ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২৮ মিটার প্রশস্ত এ সড়ক নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
প্রকল্পটির পক্ষে কক্সবাজার পৌরসভার যুক্তি—পর্যটকদের চলাচল সহজ করা, সৈকতের সৌন্দর্যবর্ধন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ভাঙন প্রবণ এলাকা সুরক্ষা। তবে নির্মাণ কাজের ধরন ও অবস্থান নিয়ে এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে পরিবেশগত উদ্বেগ। পরিবেশবিদদের প্রশ্ন—উন্নয়নের নামে যদি সৈকতের প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি ও উপকূলীয় প্রতিবেশ ধ্বংস করা হয়, তাহলে এই উন্নয়ন ভবিষ্যতে কক্সবাজারের জন্য কতটা নিরাপদ?
বালিয়াড়ি সমতল করে এগোচ্ছে নির্মাণকাজ:- সরেজমিনে দেখা গেছে, সুগন্ধা পয়েন্ট সংলগ্ন সৈকতের বিস্তীর্ণ এলাকায় বালু ফেলে জায়গা সমতল করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে বালিয়াড়ি কেটে সড়কের জন্য জায়গা তৈরি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে সাগরলতা ও অন্যান্য উপকূলীয় উদ্ভিদ।
স্থানীয় ভাবে আরও দেখা গেছে, রাতেও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে নির্মাণকাজ চলছে। ফলে বালিয়াড়ির স্বাভাবিক গঠন, বালুর চলাচল এবং উপকূলীয় উদ্ভিদ ও প্রাণবৈচিত্র্যের ওপর এর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার প্রকল্প:-
কক্সবাজার পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, নগর উন্নয়ন ও নগর শাসন প্রকল্পের আওতায় সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে হোটেল সায়মন-সংলগ্ন এলাকা পর্যন্ত প্রায় ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২৮ মিটার প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের ১৭ জুন প্রকল্পটির দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে কাজটি পায় ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই)। প্রকল্পে অর্থায়ন করছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা—জাইকা এবং বাস্তবায়ন করছে কক্সবাজার পৌরসভা। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০২৭ সালের ৫ অক্টোবরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা।
পৌরসভার যুক্তি: পর্যটন ও উপকূল সুরক্ষায় সড়ক:- কক্সবাজার পৌরসভার কর্মকর্তাদের মতে, প্রকল্পটির উদ্দেশ্য শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন নয়, এর সঙ্গে পর্যটকদের চলাচল সহজ করা, সৈকতের সৌন্দর্য বর্ধন এবং ভাঙন প্রবণ এলাকা সুরক্ষার বিষয়ও রয়েছে।
সড়কটি বাস্তবায়িত হলে সৈকত সংলগ্ন এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ার পাশাপাশি পর্যটন কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, জরুরি সেবা এবং নগর ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পরিকল্পিত অবকাঠামোর মাধ্যমে বর্তমানে বিচ্ছিন্ন ও অপরিকল্পিত ভাবে ব্যবহৃত এলাকা গুলোকে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
তবে প্রশ্ন উঠছে পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে:- পরিবেশবিদদের মূল আপত্তি হলো, সড়কটি যে এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে সেটি কক্সবাজার-টেকনাফ সমুদ্রসৈকতের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ECA)-এর অন্তর্ভুক্ত।
১৯৯৯ সালে কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূলের প্রায় ১০ হাজার ৪৬৫ হেক্টর এলাকা সরকারি ভাবে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক চিঠিতেও বালিয়াড়ির স্বাভাবিক গঠন পরিবর্তনের আগে পরিবেশগত ও উপকূলীয় ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট আইন, বিধিমালা ও আদালতের নির্দেশনা অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
বালিয়াড়ি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বালিয়াড়ি শুধুই বালুর স্তূপ নয়, এটি উপকূলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ঢেউ, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও উপকূলীয় ক্ষয়ের প্রভাব কমাতে বালিয়াড়ি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বালিয়াড়ির সঙ্গে থাকা সাগরলতা ও অন্যান্য উপকূলীয় উদ্ভিদ বালু আটকে রেখে এই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করে। ফলে বালিয়াড়ি কেটে বা সমতল করে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে দীর্ঘমেয়াদে সৈকত ভাঙন ও উপকূলীয় ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জীববৈচিত্র্যও পড়ছে ঝুঁকিতে:-
সড়ক নির্মাণের জন্য বালিয়াড়ি সমতল করার পাশাপাশি সাগরলতা ও অন্যান্য উপকূলীয় উদ্ভিদ সরিয়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। এসব উদ্ভিদ শুধু বালু ধরে রাখে না, বরং উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষাতেও ভূমিকা রাখে।
স্থানীয় পরিবেশবিদদের মতে, বালিয়াড়ি ও উদ্ভিদ ধ্বংস হলে লাল কাঁকড়া সহ বিভিন্ন উপকূলীয় প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক বালু সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হলে ভবিষ্যতে সৈকতের ভাঙন ও ভূমির স্থিতিশীলতার ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
যে বালিয়াড়ি রক্ষার উদ্যোগ ছিল, সেখানেই এখন সড়ক:- এ নিয়ে আরও একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কক্সবাজার সৈকতের ভাঙন রোধ, পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে বালুর ডেইল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিল।
পরিবেশবিদদের অভিযোগ, কয়েক বছর পর সেই বালিয়াড়িরই একটি অংশ সড়ক নির্মাণের জন্য সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে একই উপকূলকে একদিকে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলা এবং অন্য দিকে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তন করার মধ্যে নীতিগত অসঙ্গতি আছে কি না—সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
পরিবেশগত ছাড়পত্র আছে কি?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পটির পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়ে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি। বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শনের জন্য একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এরই মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়ে অনুমোদিত নকশা, পরিবেশগত ছাড়পত্র, বালিয়াড়ির স্বাভাবিক গঠন ও বালু সঞ্চালনের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব, উপকূলীয় ক্ষয়, নিষ্কাশন ব্যবস্থা, সামুদ্রিক প্রতিবেশ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের অনুমোদনসহ আট ধরনের তথ্য চেয়েছে।
একই সঙ্গে পরিবেশগত ও উপকূলীয় ঝুঁকি মূল্যায়ন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বালিয়াড়ির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনকারী কার্যক্রমে প্রচলিত আইন অনুসরণের কথাও বলা হয়েছে।
বেলার আইনি নোটিশ, বাড়ছে প্রশ্ন:- সড়ক নির্মাণের কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি—বেলা কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে আইনি নোটিশ দিয়েছে।
বেলার অভিযোগ, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া নো-ডেভেলপমেন্ট জোনে এ ধরনের নির্মাণ কার্যক্রম আইনগত প্রশ্ন তৈরি করে।
কক্সবাজারের জন্য প্রণীত মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, জোয়ার-ভাটার মধ্যবর্তী রেখা থেকে সৈকতসংলগ্ন প্রথম ৩০০ মিটার এলাকাকে নো-ডেভেলপমেন্ট জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে—এমন তথ্যও উঠে এসেছে। ফলে সড়কটির অবস্থান, নকশা, অনুমোদন এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনার দাবি জোরালো হচ্ছে।
উন্নয়ন কি থামবে, নাকি বদলাবে নকশা?
কক্সবাজারের মতো পর্যটন নির্ভর শহরে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পরিকল্পিত অবকাঠামোর প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। পর্যটকদের নিরাপদ চলাচল, জরুরি সেবা, নগর ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটন অর্থনীতির বিকাশে আধুনিক অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—সেই অবকাঠামো নির্মাণের স্থান ও পদ্ধতি কি পরিবেশগত ভাবে নিরাপদ কি না?
যদি সংবেদনশীল বালিয়াড়ি কেটে সড়ক নির্মাণের ফলে ভবিষ্যতে সৈকত ভাঙন, জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি কিংবা উপকূলীয় প্রতিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়, তাহলে প্রকল্পটির তাৎক্ষণিক সুবিধার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ব্যয়ও হিসাবের মধ্যে আনা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীদের মতে, সড়ক নির্মাণ অপরিহার্য হলে বিকল্প রুট ও তুলনামূলক পরিবেশবান্ধব নকশা বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে স্বাধীন পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) ও উপকূলীয় ঝুঁকি মূল্যায়ন, বিকল্প রুট পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও আদালতের নির্দেশনা নিশ্চিত করা জরুরি।
শেষ প্রশ্নটি তাই থেকেই যায়:-
কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত শুধু একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়। এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ, অসংখ্য উপকূলীয় প্রাণীর আবাসস্থল এবং একই সঙ্গে ঢেউ, জলোচ্ছ্বাস ও উপকূলীয় ক্ষয়ের বিরুদ্ধে একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
তাই *৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার সড়কটি কক্সবাজারের উন্নয়নের নতুন দ্বার খুলবে, নাকি ভবিষ্যতের উপকূলীয় ঝুঁকি বাড়াবে—এর উত্তর শুধু সড়ক নির্মাণ শেষ হওয়ার পর নয়, বরং নির্মাণের আগেই বিজ্ঞান সম্মত পরিবেশগত মূল্যায়নের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
কারণ উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন তা মানুষের বর্তমান প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি আগামী প্রজন্মের প্রাকৃতিক নিরাপত্তাকেও সুরক্ষিত রাখে।
সব শেষে কথা হচ্ছে উন্নয়ন হোক—কিন্তু সৈকতের অস্তিত্বের বিনিময়ে নয়।


