জেলা প্রতিনিধি, কক্সবাজার
কক্সবাজারের প্রায় ৪৫ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার শেষ ভরসাস্থল কক্সবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতাল। কিন্তু চরম প্রশাসনিক উদাসীনতা ও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে খোলা আকাশের নিচে অযত্ন- অবহেলায় জং ধরছে কোটি টাকা মূল্যের একটি অত্যাধুনিক আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স। করোনাকালে ভারত সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপহার হিসেবে পাওয়া এই অ্যাডভান্সড লাইফ সাপোর্ট (এএলএস) বা আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স টি প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি এবং দক্ষ জনবলের অজুহাতে দীর্ঘদিন ধরে পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে আছে। ফলে জরুরি মুহূর্তে চট্টগ্রাম বা ঢাকায় রেফার করা মুমূর্ষু রোগীরা পথিমধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন, অথচ জীবন রক্ষাকারী এই যানটি ধুলো আর বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে।
মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসায় কার্যকর প্রযুক্তি, তবুও ব্যবহারহীন:-
চিকিৎসকদের মতে, গুরুতর অসুস্থ বা সংকটাপন্ন রোগীদের স্থানান্তরে এই আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সের ভূমিকা অপরিসীম। এতে থাকা কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের ভেন্টিলেটর, অন-বোর্ড কার্ডিয়াক মনিটর ও ডিফিব্রিলেটরের মতো উচ্চপ্রযুক্তির চিকিৎসা সরঞ্জাম চট্টগ্রাম বা ঢাকা পর্যন্ত দীর্ঘ ৩ থেকে ৭ ঘণ্টার ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় হৃদরোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীর জীবন সচল রাখতে সক্ষম। বর্তমানে করসহ এই ধরনের একটি লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্সের বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি টাকা। কিন্তু এমন মূল্যবান ও কার্যকর একটি সম্পদ গ্যারেজ বা শেডের সুবিধাও পাচ্ছে না, খোলা আকাশের নিচে ফেলে রাখায় ভেতরের কোটি টাকার মেডিকেল ইকুইপমেন্ট চিরতরে বিকল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
অচল পড়ে থাকার মূল কারণ ও প্রশাসনিক স্থবিরতা:-
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মূলত সমন্বয়হীনতা ও সিদ্ধান্তের অভাবেই অচল হয়ে রয়েছে অ্যাম্বুলেন্সটি:
১. দক্ষ জনবল ও চালকের সংকট:- অ্যাম্বুলেন্সে থাকা ভেন্টিলেটর ও প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য ভেন্টিলেটর-প্রশিক্ষিত ক্রিটিক্যাল কেয়ার চিকিৎসক, আইসিইউ-প্রশিক্ষিত নার্স এবং সংবেদনশীল গাড়িটি চালনার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ড্রাইভার প্রয়োজন। হাসপাতালে সাধারণ স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি থাকায় আলাদা ক্রু পদায়ন করা হয়নি।
২. বাজেট ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাব:- লাইফ সাপোর্ট যন্ত্রপাতির নিয়মিত ক্যালিব্রেশন, মেইনটেন্যান্স এবং অতিরিক্ত জ্বালানি খরচের জন্য সরকারিভাবে পৃথক বাজেট বরাদ্দ নেই। এছাড়া রোগী পরিবহন বা ভাড়া নির্ধারণের জন্য এখনো কোনো পরিচালনা নীতিমালা (এসওপি) তৈরি করা হয়নি।
কক্সবাজারের বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিগত এবং বর্তমান জেলা প্রশাসকের কাছে অ্যাম্বুলেন্সটি দ্রুত চালু করার জন্য একাধিকবার লিখিত আবেদন জানিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ দুই বছরেও জেলাবাসী এর কোনো সুফল পায়নি।
জনগণের সেবায় অবিলম্বে উন্মুক্ত করার যৌক্তিকতা:-
প্রতিদিন কক্সবাজার সদর হাসপাতাল থেকে একাধিক মুমূর্ষু রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম বা ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালে রেফার করা হয়। একটি আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সের অভাবে প্রতি মাসে অনেক দরিদ্র ও হতদরিদ্র পরিবার স্বজন হারাচ্ছেন।
সামান্য প্রশাসনিক উদ্যোগে এটি চালু করা সম্ভব!
এনজিও সমন্বয় ও জনবল:- কক্সবাজারে স্বাস্থ্য খাতে বহু আন্তর্জাতিক ও দেশীয় এনজিও কাজ করছে। তাদের সাথে জেলা প্রশাসন ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সামান্য সমন্বয় করলেই দক্ষ চিকিৎসক, নার্স ও ড্রাইভারের সুব্যবস্থা করা সম্ভব।
আত্মনির্ভরশীল পরিচালনা মডেল:- সাধারণ মানুষ যখন এই অ্যাম্বুলেন্স সেবা গ্রহণ করবেন, তখন নির্ধারিত একটি যৌক্তিক সেবা-ফি/ভাড়া থেকেই গাড়ির নিয়মিত জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অনায়াসে উঠে আসবে।
পিপিপি মডেল:- সরকারি- বেসরকারি যৌথ অংশীদারিত্ব (পিপিপি) বা বিশেষ জেলা তহবিলের মাধ্যমে অ্যাম্বুলেন্সটি পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবি।
ড্রাইভার আছে চলে না এ্যাম্বুলেন্স, কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে দুইজন ড্রাইভার কর্মরত থাকলেও এই কোটি টাকা মূল্যের এ্যাম্বুলেন্স চলে না, সম্প্রতি কক্সবাজার জেলার সিভিল সার্জন ডা: মোহাম্মদ সাবের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে, তিনি বলেন বর্তমানে যে ড্রাইভার গুলো আছে তারা এই এ্যাম্বুলেন্স চালিয়ে অভ্যস্ত না তাই তারা এই এ্যাম্বুলেন্স চালাতে চায় না ।যার কারনে পড়ে আছে বলে মন্তব্য করেন ।
জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে অবিলম্বে পরিচালনা নীতিমালা (এসওপি) চূড়ান্ত করা এবং প্রয়োজনীয় প্রেষণে জনবল পদায়ন কিংবা এনজিও-সমন্বয়ের মাধ্যমে কোটি টাকার এই অ্যাম্বুলেন্সটি ৪৫ লাখ মানুষের সেবায় উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন কক্সবাজারের সর্বস্তরের সচেতন মহল। সরকারি এই সম্পদের অপচয় রোধ করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এটি কেবল একটি গাড়ির অবক্ষয় নয়, বরং বহু মুমূর্ষু মানুষের জীবনরক্ষার সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার সামিল হবে।


