মোঃ শাহজালাল, বরগুনা\
বরগুনায় দুটি আসনেই বইছে নির্বাচনী হাওয়া\ আওয়ামী লীগের আধিপত্য ভাঙতে প্রস্তুত বিএনপি\ ভোট বাড়াতে মনোনিবেশ করছে ইসলামী দলগুলো\
লন্ডনে অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস ও বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সফল বৈঠকের পরে পুরোদমে নির্বাচনী কর্মকান্ডে মনোনিবেশ করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। নিজেদের ঘর গোছানোর পাশাপাশি ভোটারদের মন জোগাতে নানামুখী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন নেতা-কর্মীরা। দেশের উপকূলীয় জেলা বরগুনার চিত্রও এর ব্যতিক্রম নয়।
বরগুনা সংসদীয় আসন ১০৯ (বরগুনা সদর-আমতলী ও তালতলী) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ইতিমধ্যেই প্রতিটি আসনে প্রার্থী চ‚ড়ান্ত করেছে, যার ধারাবাহিকতায় বরগুনার জনপদে প্রার্থীরা গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন। বরগুনা-১ আসনটি বরাবরই আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হলেও, এবার দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আসনটি ধরে রাখতে মরিয়া বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জামায়াত ইসলামীর প্রার্থীরা। তবে শেষ মুহূর্তে স্বতন্ত্র প্রার্থী বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীও নির্বাচনে চমক দেখাতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের মানচিত্রে সর্ব দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে বরগুনা জেলা অবস্থিত। দক্ষিনে বঙ্গোপসাগর আর বরগুনা সদর ও বেতাগী উপজেলার দুইপাশ থেকে প্রবাহিত হয়েছে বিষখালি ও পায়রার মত বিশাল দুইটি নদী। তাই এ জেলায় সড়ক পথের পাশাপাশি নৌপথই হচ্ছে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
ছয়টি উপজেলা ও চারটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত জেলাটিতে সংসদীয় আসন সংখ্যা দুইটি। যদিও ইতোপূর্বে জেলায় তিনটি সংসদীয় আসন ছিল। ভৌগলিক ও অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সেটাই ছিল যৌক্তিক। ২০০৮ সালে এক এগারো সরকার আওয়ামী লীগকে বিশেষ সুবিধা করে দিতে দেশের নির্বাচনী সীমানা পুন:র্বিন্যাস করে। তখন বরগুনার আসন সংখ্যা তিনটি থেকে কমিয়ে দুইটি করা হয়। ফলে এখানকার রাজনীতির হিসাব-নিকাশ অনেকটা পাল্টে যায়। যদিও স্বাধীনতার পর থেকে অধিকাংশ সময়ই জেলার কর্তৃত্ব ছিল আওয়ামী লীগের হাতে। বিশেষ করে স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের আমলে দশম থেকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নজিরবিহীন কারচুপি, প্রহসন, রাতের ভোট, বিনা ভোট ও ডামি ভোটের কারণে আরও পাকাপোক্ত হয় তাদের অবস্থান।
মৎস্য ও কৃষি নির্ভর এ জেলাটি সব সময়ই ছিল অবহেলিত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগসহ কোন ক্ষেত্রেই কাঙ্খিত উন্নয়নের দেখা পায়নি জেলাটি। ক্ষমতায় থাকাকালে আওয়ামী লীগের সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট এবং নানা বিতর্কিত কর্মকান্ডের কারনে বারবার সামনে এসেছে বরগুনা জেলার নাম। তবে চব্বিশে ছাত্র জনতার গণআন্দোলনে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেলে পাল্টে যায় এখানকার রাজনৈতিক চালচিত্র। বর্তমানে মাঠ ছাড়া আওয়ামী লীগ ও তার দোসর জাতীয় পার্টি। এ সুযোগে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বিএনপি, জামায়াতসহ অন্যান্য দলগুলো।
বরগুনা সদর, আমতলী ও তালতলী নিয়ে গঠিত বরগুনা-১ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লক্ষ ১২ হাজার ৬০৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লক্ষ ৫৫ হাজার ১২৭ জন এবং নারী ভোটার ২ লক্ষ ৫৭ হাজার ৪৬৫ জন। বরগুনা সদর ১০টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত, যার মোট ভোটার সংখ্যা ২ লক্ষ ৪৪ হাজার ২২০ জন। আমতলী উপজেলা ৭টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত, ভোটার সংখ্যা ১ লক্ষ ৮৫ হাজার ৭২৪ জন। তালতলী উপজেলা ৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত, ভোটার সংখ্যা ৮৬ হাজার ৯৪২ জন।
বরগুনা-১ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘোষিত ৩১ দফা নিয়ে বিভিন্ন জনসভা, মিছিল ও সভার আয়োজন করেছেন। অন্যান্য দলগুলোও তৃণমূল পর্যায়ে সভা, সমাবেশ ও গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছে। জনপদের চা-দোকান ও হাট-বাজারে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কে হবেন নতুন সংসদ সদস্য। বরগুনা-১ আসনের নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের মধ্যে চলছে নানান হিসাব নিকাশ।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জেলার দুইটি আসনেই দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। প্রার্থীরাও ভোটারদের মন জোগাতে কাজ শুরু করেছে। আগামী বছর ফেব্রæয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে পারে এমন সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় এখন পুরোদমে মাঠে নেমে পড়েছে জামায়াত বিএনপসহ সমমনা দলগুলো। তবে এখন পর্যন্ত জেলায় জাতীয় নাগরিক পার্টি, গণঅধিকার পরিষদসহ অন্যান্য দলের তেমন কোন কার্যক্রম চোখে পড়েনি। এসব দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে তারা দল গোছানো ও যোগ্য প্রার্থী খোঁজার কাজ করছেন। নির্বাচনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হলে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।
এদিকে, আওয়ামী লীগকে বিশেষ সুবিধা দেয়ার লক্ষ্যে আসন সংখ্যা কমানোয় উন্নয়ন বঞ্চিত বরগুনার মানুষ দীর্ঘদিন থেকেই তিনটি আসনে ফিরে আসার দাবি জানিয়ে আসছে। এ লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন সভা-সমাবেশ, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছে। ইতোমধ্যে আসন বাড়ানোর যৌক্তিকতা তুলে ধরে তারা নির্বাচন বিষয়ক সংস্কার কমিশন ও নির্বাচন কমিশনে পৃথক পৃথক স্মারকলিপি দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগামী নির্বাচনে এক এগারো সরকারের ষড়যন্ত্রমূলক নির্বাচনী আসন বিন্যাস বাদ দেওয়া হতে পারে। এমনটা হলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার আসন সংখ্যা একটি বেড়ে তিনটি হতে পারে। সেক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে আসন ভিত্তিক প্রার্থী তালিকা পরিবর্তন হবে এবং পাল্টে যাবে ভোটের হিসাব নিকাশও।
১০৯, বরগুনা-০১ আসন :
দেশের সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত বরগুনা জেলার বরগুনা সদর, আমতলী ও তালতলী উপজেলা নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ১০৯, বরগুনা-০১ আসনটি গঠিত হয়েছে। ২০০৮ সালে নতুন করে আসন বিন্যাসের আাগে বরগুনা সদর উপজেলাটি বরগুনা-০১ আসনের অংশ ছিল এবং আমতলী ও তালতলী উপজেলা নিয়ে ছিল বরগুনা-০৩ আসন। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরগুনা-০১ আসনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মোঃ দেলোয়ার হোসেন এবং বরগুনা-০৩ আসনে প্রথমে শেখ হাসিনা এবং উপ-নির্বাচনে বিএনপি’র মোঃ মতিয়ার রহমান তালুকদার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। নবম, দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনটিতে আওয়ামী লীগের অ্যাড. ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এবং দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী গোলাম সরোয়ার টুকু নির্বাচিত হন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর পাল্টে গেছে এখানকার রাজনৈতিক হিসাব নিকাশ। আওয়ামী সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, অত্যাচার এবং সাবেক এমপি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছত্রছায়ায় বরগুনায় মাদক ব্যবসার সীমাহীন প্রসার ঘটায় মানুষ আওয়ামী লীগ থেকে একেবারে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। যে কারণে অবস্থার উন্নতি হয়েছে বিএনপিসহ অন্যান্য সমমনা রাজনৈতিক দলের।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ আসনে বিএনপি’র মনোনিত প্রার্থী বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বরগুনা জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মোল্লা। এরমধ্যে নজরুল ইসলাম মোল্লাকে ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাবেক সংসদ সদস্য মতিউর রহমান তালুকদারের সাথে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে বিএনপি মতিউর রহমান তালুকদারের মনোনয়ন চূড়ান্ত করলে নজরুল ইসলাম মোল্লা তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন।
বরগুনা-১ আসনের ধানের শীষের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এবং জেলা আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. নজরুল ইসলাম মোল্লা নির্বাচনী আসনের প্রতিটি উপজেলার হাট-বাজারে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রণীত ৩১ দফার লিফলেট বিতরণ ও জনগণের সঙ্গে কুশল বিনিময় এবং পথসভা করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, “রাজনীতির মাঠে বিএনপির পরীক্ষিত নেতা হিসেবে আমি জনগণের পাশে ছিলাম ও ভবিষ্যতেও থাকবো, উন্নয়ন গণতন্ত্র ও জনঅধিকার প্রতিষ্ঠায় জনগণের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। আমি সকলের দোয়া ও সমর্থনে দলকে এই আসনটি উপহার দিতে চাই। অনুন্নত বরগুনাকে উন্নয়নের রূপ দিতে চাই। অন্যায়, অত্যাচার ও লুটপাটের রাজনীতি বরগুনা-১ আসন থেকে চিরতরে নির্মূল করতে চাই। সাধারণ মানুষ ও নতুন প্রজন্ম আমার প্রতি আস্থা রাখে, ইনশাআল্লাহ তারা ভোট দিয়ে আমাকে বিজয়ী করবে।
বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী, জেলা আমীর মাওলানা মহিব্বুল্লাহ হারুন বলেন, জনগণের অধিকার ও ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠাই আমাদের লক্ষ্য। যদি জনগণ আমাদের উপরে আস্থা রাখে, আমরা পরিবর্তনের রাজনীতি দেখাব। তিনি এলাকায় নিয়মিত গনসংযোগ করছেন। তিনি বলেন, জনগন এখন ইসলামী দলকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান থাকাকালীন নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছি। যেখানে যাচ্ছি জনগণের আকুন্ঠ সমর্থন পাচ্ছি। আশা করছি আগামী নির্বাচনে জমায়াতে ইসলামীকে আসনটি উপহার দিতে পারবো ইনশাআল্লাহ।আগামী নির্বাচনে বিপুল ভোটে আমি বিজয়ী হব।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বরগুনা জেলা শাখার প্রধান উপদেষ্টা পীর সাহেব কেওড়াবুনিয়া মাওলানা মাহামুদুল হোসাইন ওয়ালিউল্লাহ বরগুনা-১ আসনের মনোনীত প্রার্থী। তিনিও এই আসনে নির্বাচনের বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। দলীয় সূত্র জানায়, বরগুনায় তাদের অবস্থান খুবই মজবুত। বিগত দিনে ভোট কারচুপি ও দিনের ভোট আগের রাতে করে প্রার্থীদের হারানো হয়েছে। ৫ই আগস্টের পর বরগুনাবাসী ইসলামী দলের কার্যক্রমে সন্তুষ্ট, তারা অন্য দলের ন্যায় চাঁদাবাজি ও দখল বাণিজ্য করেনি। তিনি আশাবাদী, এবারের নির্বাচনে এই আসনের তিনটি উপজেলাতেও তারা বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন।
এই আসনের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বরগুনা-১ আসনে এবার প্রতিদ্ব›িদ্বতা তীব্র হবে। অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও চমক দেখাবে। প্রতিটি দলের প্রার্থীরা জনপ্রিয়। ভোটের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না কে বিজয়ী হবেন। তবে তিনটি উপজেলায় বিএনপি ঐক্যবদ্ধ থাকলে ফল তাদের পক্ষে যেতে পারে বলে মনে করেন জনগন।
এই আসনটিতে ভোটের দিক থেকে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন। বিগত কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। আসনটিতে ইসলামী আন্দোলনের সম্ভাব্য প্রার্থী দলটির প্রধান উপদেষ্টা মাওলানা মাহমুদুল হোসাইন ওয়ালীউল্লাহ। ইসলামী আন্দোলনের জেলার সভাপতি মুফতি মোঃ মিজানুর রহমান বলেন, বরগুনায় আমাদের ভোটব্যাঙ্ক রয়েছে। বিগত নির্বাচনগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করলে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। বরগুনা-০১ আসনে আসন্ন নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আমরা খুবই আশাবাদী।
এই আসনটিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি, গণঅধিকার পরিষদসহ অন্যান্য দলের তেমন কোন কার্যক্রম নেই। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তাদের তেমন কোনও তৎপরতাও লক্ষ্য করা যায়নি।
১১০, বরগুনা-০২ আসন :
জেলার পাথরঘাটা, বামনা ও বেতাগী উপজেলা নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ১১০, বরগুনা-০২ আসনটি গঠিত হয়েছে। ২০০৮ সালের আগে বেতাগী উপজেলাটি বরগুনা-০১ আসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং পাথরঘাটা ও বামনা উপজেলা নিয়ে বরগুনা-০২ আসনটি গঠিত ছিল। পরবর্তীতে সীমানা পুনঃনির্ধারণের পর বেতাগী উপজেলাকে বরগুনা-০২ আসনের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়।
২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরগুনা-০২ আসনে বিএনপি প্রার্থী আলহাজ্ব নূরুল ইসলাম মণি নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে ১৯৮৮ ও ১৯৯১ সালে তিনি স্বতন্ত্র এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানুষের ভোটাধিকার হরণ করে এ আসনে আওয়ামী লীগের গোলাম সবুর টুলু, শওকত হাচানুর রহমান রিমন ও সুলতানা নাদিরা এমপি নির্বাচিত হন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর পাল্টে গেছে এখানকার নির্বাচনী হিসাব নিকাশ।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ আসনে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন বিএনপি’র কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান, জেলা বিএনপি’র সাবেক সভাপতি ও বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আলহাজ্ব নূরুল ইসলাম মণি। তিনি এ আসন থেকে তিন বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং প্যানেল স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেছেন। এখানে মুলত তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয় তাই বিএনপিকে অন্যসব দল থেকে এগিয়ে রেখেছে।
বরগুনা -২ আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী নুরুল ইসলাম মণি বলেন, এ এলাকার সার্বিক উন্নয়ন আমার হাত দিয়ে হয়েছে। আমি এমপি হওয়ার আগে এখানে কিছুই ছিল না। আমি নির্বাচিত হয়ে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, মানুষের মানবিক উন্নয়নসহ যাবতীয় কাজ করেছি। মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নানা কাজ করেছি। এলাকায় অসংখ্য লোককে চাকুরি দিয়েছি। এজন্য এলাকার মানুষ আমার পক্ষে অবস্থান করছে। তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার আমার জনপ্রিয়তাকে ভয় পেয়ে বিগত ১৫ বছর আমাকে এলাকায় আসতে দেয়নি। মামলা হামলা করে আমাকে শেষ করে দিতে চেয়েছে। কিন্তু, আমি শত বাঁধার পরেও দলের প্রশ্নে আপসহীন থেকেছি। আশা করছি আগামী নির্বাচনে আসনটি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানকে উপহার দিতে পারবো ইনশাআল্লাহ।
আসনটিতে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের মজলিসে শুরা সদস্য ডাঃ সুলতান আহমেদকে প্রার্থী করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনি এলাকায় গণসংযোগ শুরু করেছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে সারা দেশেই জামায়াতের অবস্থা আগের যেকোন সময়ের চেয়ে ভালো। এ আসনেও এর ব্যতিক্রম নেই। ইতোমধ্যে তিনটি উপজেলায়ই সভা সমাবেশ করেছি। এসময়ে মানুষের যথেষ্ট সমর্থন পেয়েছি। আশা করছি জনগণের এ ভালোবাসা আমাকে জয়ী হতে সাহায্য করবে।
ইসলামী আন্দোলনের জেলার সভাপতি মুফতি মোঃ মিজানুর রহমানকে বরগুনা-১ আসনের মনোনীত প্রার্থী করা হয়ে। তিনি বলেন, বরগুনায় আমাদের ভোটব্যাঙ্ক রয়েছে। বিগত নির্বাচনগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করলে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। এ আসনেও ইসলামী আন্দোলনেরও কিছু রিজার্ভ ভোট রয়েছে। তিনিও এই আসনে নির্বাচনের বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। দলীয় সূত্র জানায়, বরগুনায় তাদের অবস্থান খুবই মজবুত। বিগত দিনে ভোট কারচুপি ও দিনের ভোট আগের রাতে করে প্রার্থীদের হারানো হয়েছে। ৫ই আগস্টের পর বরগুনাবাসী ইসলামী দলের কার্যক্রমে সন্তুষ্ট, তারা অন্য দলের ন্যায় চাঁদাবাজি ও দখল বাণিজ্য করেনি। বরগুনা-০২ আসনে আসন্ন নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আমরা খুবই আশাবাদী।
এ আসনেও জাতীয় নাগরিক পার্টি, গণঅধিকার পরিষদসহ অন্যান্য দলের তেমন কোন কার্যক্রম নেই বললেই চলে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও তাদের তেমন কোনও তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
বরগুনার বিভিন্ন উপজেলার ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আসন্ন নির্বাচনে সৎ, যোগ্য এবং এলাকার উন্নয়নের জন্য নিবেদিত প্রাণ প্রার্থীকেই তারা বেছে নেবেন। বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যার চিন্তয় ও মনে অপরিসীম দেশপ্রেম রয়েছে, ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে যার পরিষ্কার অবস্থান থাকবে এমন প্রার্থীকে ভোট দিতে চান জনগন।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিগত সরকারের আমলে ভোট শব্দটি মানুষ ভুলে গিয়েছিল। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম বিগত তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি। বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মানুষের ভোটদানের একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে কাংখিত সংস্কারবিহীন নির্বাচন ফলপ্রসূ হবে না।



