মো. কামরুল হাসান, কক্সবাজার প্রতিনিধি
বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পর্যটন নগরী, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের শহর, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতার অন্যতম কেন্দ্র এবং বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী জনগোষ্ঠীর আশ্রয়স্থল কক্সবাজার। অথচ এই জেলার প্রায় ৪৫ লাখ মানুষের জীবন রক্ষার একমাত্র সরকারি বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র ২৫০ শয্যার কক্সবাজার সদর হাসপাতাল আজও মৌলিক জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতিতে ভুগছে। কাগজে-কলমে আধুনিক জেলা সদর হাসপাতাল হলেও বাস্তবে এটি ক্রমশ একটি বিশাল ‘রেফারেল সেন্টারে’ পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ চিকিৎসাসেবা প্রত্যাশীদের। হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, কিডনি বিকল, গুরুতর দুর্ঘটনা, দগ্ধ রোগী কিংবা সংকটাপন্ন রোগীদের অধিকাংশকেই এখনো চট্টগ্রাম অথবা ঢাকায় পাঠানো হয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় প্রতিবছর অসংখ্য রোগী পথেই মারা যাচ্ছেন অথবা স্থায়ী শারীরিক জটিলতার শিকার হচ্ছেন।
২৫০ শয্যা বনাম ৪৫ লাখ মানুষের বাস্তবতা :- জেলার স্থায়ী জনসংখ্যা প্রায় ২৯ লাখ। এর সঙ্গে উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থানরত প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা এবং বিভিন্ন মেগা প্রকল্প, পর্যটন শিল্প ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত প্রায় ১ লাখ বহিরাগত কর্মী যোগ করলে কক্সবাজারে চিকিৎসাসেবার ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৪৫ লাখ।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সুপারিশ অনুযায়ী প্রতি ১ হাজার মানুষের জন্য ন্যূনতম ৩টি হাসপাতাল শয্যা থাকা প্রয়োজন। সেই হিসাবে কক্সবাজার অঞ্চলের জন্য প্রয়োজন কমপক্ষে ১৩ হাজার ৫০০ শয্যা।কিন্তু জেলার প্রধান সরকারি হাসপাতালটিতে রয়েছে মাত্র ২৫০টি শয্যা। অর্থাৎ প্রতি ১৮ হাজার মানুষের জন্য রয়েছে মাত্র ১টি হাসপাতাল শয্যা—যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় প্রায় ৫৪ গুণ কম।
রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম চিকিৎসক-নার্সরা :-হাসপাতালের অনুমোদিত জনবল কাঠামো (অর্গানোগ্রাম) এবং এইচআরএম ডাটাবেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, বহু গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি সবচেয়ে প্রকট কার্ডিওলজি, নেফ্রোলজি, ক্রিটিক্যাল কেয়ার, নিউরোলজি, বার্ন ও ট্রমা কেয়ার বিভাগে। প্রতিদিন হাজার হাজার বহির্বিভাগ রোগী এবং শত শত ভর্তি রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর তৈরি হচ্ছে অমানবিক কর্মচাপ।স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান জনবল দিয়ে ৪৫ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কার্যত অসম্ভব।
হার্ট অ্যাটাক মানেই চট্টগ্রাম বা ঢাকা :- কক্সবাজারে এখনো পূর্ণাঙ্গ কার্ডিয়াক কেয়ার ইউনিট (CCU) এবং আধুনিক ক্যাথল্যাব নেই। ফলে কোনো রোগীর হার্ট অ্যাটাক হলে জরুরি এনজিওগ্রাম বা এনজিওপ্লাস্টির ব্যবস্থা করা যায় না। চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, হার্ট অ্যাটাকের পর প্রথম ৬০ মিনিটকে বলা হয় “Golden Hour”। এই সময়ের মধ্যে চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছাতে প্রায় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা সময় লাগে। ঢাকায় নিতে লাগে আরও বেশি সময়। ফলে অনেক রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যুবরণ করেন।
কিডনি রোগীদের জন্য নেই পর্যাপ্ত ডায়ালাইসিস ব্যবস্থা :- ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কক্সবাজার জেলায় দ্রুত বাড়ছে। তবে সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত আধুনিক ডায়ালাইসিস সুবিধা না থাকায় দরিদ্র রোগীদের মাসে কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা ব্যয় করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। অনেক পরিবার চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে না পেরে রোগীকে চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে।স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তত ৪০ শয্যার একটি আধুনিক ডায়ালাইসিস সেন্টার জরুরি ভিত্তিতে স্থাপন করা প্রয়োজন।
ট্রমা ও বার্ন ইউনিট না থাকায় বাড়ছে ঝুঁকি :- কক্সবাজারে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটকের আগমন ঘটে। এছাড়া মেরিন ড্রাইভ, মহাসড়ক, উন্নয়ন প্রকল্প এবং শিল্পকারখানায় কর্মরত বিপুল সংখ্যক শ্রমিক দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে থাকেন। অন্যদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রায়ই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। কিন্তু জেলা সদর হাসপাতালে এখনো পূর্ণাঙ্গ বার্ন ও ট্রমা ইউনিট নেই। ফলে গুরুতর আহত রোগীদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অথবা ঢাকায় পাঠাতে হয়।
দুর্যোগ প্রবণ অঞ্চলে নেই পর্যাপ্ত আইসিইউ :- ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নৌদুর্ঘটনা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য কক্সবাজার বাংলাদেশের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। দুর্যোগের সময় একসঙ্গে শত শত আহত ও সংকটাপন্ন রোগী চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু বর্তমান আইসিইউ সুবিধা এই বিশাল জনগোষ্ঠীর তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তত ৪০ শয্যার আধুনিক সেন্ট্রাল আইসিইউ এবং হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিট (HDU) স্থাপন এখন সময়ের দাবি।
আন্তর্জাতিক গুরুত্বের অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার বৈপরীত্য :- কক্সবাজারে নিয়মিত জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, ইউএনএইচসিআর, আইওএম, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা সফর করেন। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, মেগা অবকাঠামো প্রকল্প, পর্যটন শিল্প এবং রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলার কারণে জেলার কৌশলগত গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবুও এখানে এখনো বিশ্বমানের ক্রিটিক্যাল কেয়ার সেন্টার গড়ে ওঠেনি। স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, “আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত একটি জেলায় আধুনিক ক্যাথল্যাব, পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ কিংবা বার্ন ইউনিট না থাকা জাতীয়ভাবে উদ্বেগজনক।”
কী কী প্রয়োজন ?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ অনুযায়ী জরুরি ভিত্তিতে—
• হাসপাতালকে ২৫০ শয্যা থেকে ৫০০ বা ১০০০ শয্যায় উন্নীত করা।
• ৪০ শয্যার আধুনিক ডায়ালাইসিস সেন্টার চালু করা।
• পূর্ণাঙ্গ কার্ডিওভাসকুলার বিভাগ ও ক্যাথল্যাব স্থাপন।
• ৪০ শয্যার সিসিইউ (CCU) চালু করা।
• ৪০ শয্যার সেন্ট্রাল আইসিইউ ও এইচডিইউ স্থাপন।
• ৩০ শয্যার বিশেষায়িত ট্রমা ও বার্ন ইউনিট চালু করা।
• শূন্যপদে চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্ট নিয়োগ।
• উন্নত ল্যাবরেটরি, সিটি স্ক্যান, এমআরআই ও জরুরি অপারেশন থিয়েটার সম্প্রসারণ।
• রোহিঙ্গা সংকট বিবেচনায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বিশেষ স্বাস্থ্য তহবিল গঠন।
•
সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন :- বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদে নাগরিকদের চিকিৎসাসহ মৌলিক জীবনধারণের উপকরণ নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১৮(১) অনুচ্ছেদে জনগণের স্বাস্থ্য উন্নয়নকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রাথমিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—পর্যটন, আন্তর্জাতিক মানবিক কার্যক্রম এবং জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা কক্সবাজারের ৪৫ লাখ মানুষ কি তাদের সাংবিধানিক স্বাস্থ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন?
এখনই সিদ্ধান্তের সময় :- বিশেষজ্ঞদের মতে, কক্সবাজার সদর হাসপাতালকে আর একটি সাধারণ জেলা হাসপাতাল হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। জেলার জনসংখ্যা, পর্যটন শিল্প, রোহিঙ্গা বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উপস্থিতি এবং দুর্যোগ ঝুঁকি বিবেচনায় এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক বিশেষায়িত মেডিকেল কমপ্লেক্সে রূপান্তর করা জরুরি। অন্যথায় প্রতিদিন অসংখ্য রোগীকে “রেফার” করার এই সংস্কৃতি অব্যাহত থাকবে, আর জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসার অভাবে হারিয়ে যাবে আরও অনেক মূল্যবান প্রাণ।


