মোঃ হযরত আলী শান্ত, সাতক্ষীরা শ্যামনগর থেকে।।
সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ৬ নং রমজাননগর ইউনিয়নের ৬ নং সোরা গ্রামে লবণ পানি উত্তোলন বন্ধ, কৃষি জমি রক্ষা এবং টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবিতে এক বিশাল মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোরা গ্রাম সুশীল সমাজ সংগঠন ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে আয়োজিত এই মানববন্ধনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা উপকূলীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান লবণ পানির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং পরিবেশ ও জনজীবন রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান। কর্মসূচিতে নারী, পুরুষ, কৃষক, মৎস্যজীবী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার প্রদর্শন করেন। তাদের হাতে থাকা ফেস্টুনে লেখা ছিল— লবণ পানি নয়, নিরাপদ পরিবেশ চাই, মাটি বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও, লবণ পানির আগ্রাসন রুখে দেবে জনগণ, কৃষি জমি রক্ষায় সবাই এগিয়ে আসুন, সুন্দরবনের প্রাণ বাঁচাও, লবণ পানি বন্ধ কর, সবার সুপেয় পানির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবার, পরিবেশ ধ্বংস বন্ধ কর, মানুষের জীবন রক্ষা কর, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাঁচাতে পরিবেশ রক্ষায় নামতে হবে, জনগণের একটাই দাবি, লবণ পানি মুক্ত গ্রাম চাই এবং জীবন ও প্রকৃতির স্বার্থে লবণ পানির বিরুদ্ধে ঐক্য গড়তে হবে।
বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবাধে লবণ পানি উত্তোলন ও প্রবেশের কারণে এলাকার কৃষি জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। একসময়ের সবুজ ফসলি জমি আজ অনাবাদি হয়ে পড়ছে। ধান, শাক-সবজি ও অন্যান্য ফসলের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ফলে কৃষকরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন এবং অনেক পরিবার জীবিকা সংকটে পড়েছে।
তারা আরও বলেন, লবণাক্ততার কারণে পুকুর, খাল ও জলাশয়ের পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। সুপেয় পানির সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে।
অনেক মানুষকে দূর-দূরান্ত থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে গবাদিপশু পালন, গৃহস্থালি কাজ এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, লবণ পানির অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার শুধু কৃষি ও মানুষের জীবন-জীবিকাকেই হুমকির মুখে ফেলছে না, বরং স্থানীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সুন্দরবন সংলগ্ন এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
এ সময় বক্তারা টেকসই ও মজবুত বেড়িবাঁধ নির্মাণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা বলেন, দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের কারণে জোয়ার-ভাটার সময় লবণ পানি বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করে কৃষি জমি ও বসতভিটা ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই উপকূলীয় জনগণের জীবন, সম্পদ ও কৃষি রক্ষায় স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই।
সমাবেশে বক্তারা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। তারা লবণ পানি উত্তোলন বন্ধ, কৃষি জমি সংরক্ষণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানান।
মানববন্ধন শেষে আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি ও মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষার স্বার্থে এই আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। জনগণের ন্যায্য দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চলবে বলে তারা ঘোষণা দেন।
স্থানীয়দের মতে, লবণ পানির আগ্রাসন বন্ধ এবং টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি উৎপাদন ও মানুষের জীবন-জীবিকা আরও বড় সংকটের মুখে পড়বে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ জীবন ও একটি বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।


