জেলা প্রতিনিধি
বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্পের উপজেলা হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার জেলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন সাগরদ্বীপ মহেশখালী। চারদিকে জলবেষ্টিত এই উপজেলার কয়েক লাখ মানুষের জরুরি ও বিশেষায়িত চিকিৎসার ভরসা সরকারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং কিছু বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। তবে তদারকিহীনতা, প্রশাসনিক শিথিলতা এবং নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে গড়ে ওঠা এসব বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রের বড় একটি অংশ এখন চলছে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে। লাইসেন্সের শর্তাবলী অমান্য করে সেবা দেওয়ার ফলে দ্বীপাঞ্চলের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
কাগজে-কলমে লাইসেন্স ও নবায়নের জট (শর্ত ৭ ও শর্ত ৬ লঙ্ঘন)
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি বেসরকারি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজি ল্যাবকে প্রতি বছর নির্দিষ্ট ফি জমা দিয়ে লাইসেন্স নবায়ন করতে হয়। লাইসেন্স সনদের ৭ নম্বর শর্তে স্পষ্ট বলা হয়েছে- মেয়াদের শেষ তারিখ থেকে এক মাসের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট নবায়ন করতে ব্যর্থ হলে, উল্লেখিত মেয়াদের শেষ তারিখ থেকেই তা বাতিল বলে গণ্য হবে।
অথচ জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের গত ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সর্বশেষ পর্যালোচনার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মহেশখালী উপজেলার তালিকাভুক্ত ৯টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেরই মেয়াদের অনুমোদন অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে: ১. সুফিয়া মোজাহের হেলথ কেয়ার (মহেশখালী): ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের পর টানা ৩ বছর ধরে কোনো ধরনের নবায়ন ছাড়াই চলছে। ২. আইল্যান্ড হেলথ কেয়ার (মহেশখালী): ‘ডায়াগনস্টিক-সি’ ক্যাটাগরির এই ল্যাবটির মেয়াদ ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরেই শেষ হয়েছে। ৩. মাতারবাড়ী ডিজিটাল হাসপাতাল ও ডায়াবেটিস সেন্টার (ডায়াগনস্টিক-বি): লাইসেন্সের মেয়াদ ২০২৩-২০২৪ সালের পর আর নবায়ন করা হয়নি। ৪. মাতারবাড়ী ডিজিটাল হাসপাতাল ও ডায়াবেটিস সেন্টার (১০ শয্যা হাসপাতাল): গুরুত্বপূর্ণ এই হাসপাতালটির লাইসেন্সের মেয়াদ ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে উত্তীর্ণ হলেও নবায়ন ছাড়াই রোগী ভর্তি ও চিকিৎসা অব্যাহত রাখা হয়েছে। ৫. বিজিএস হেলথ অ্যান্ড প্যাথলজি সেন্টার (মাতারবাড়ী): সিভিল সার্জন অফিসের প্রদানকৃত তথ্য অনুযায়ী নবায়ন করা হয় না্ই, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেছেন নবায়ন করেছে । ৬. নিউটন হেলথ, ৭. মহেশখালী প্যাথলজি, ৮. ওয়ান হেলথ কেয়ার এবং ৯. মডেল হেলথ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনুমোদন ২০২৫-২০২৬ মেয়াদ পর্যন্ত হলেও হালনাগাদ তথ্য নিয়ে জটিলতা রয়ে গেছে।
লাইসেন্সের ৭ নম্বর শর্তানুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স আইনত বাতিল হয়ে গেলেও তারা অবৈধ ভাবে চিকিৎসা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্য দিকে, ৬ নম্বর শর্তে বলা রয়েছে- আইনের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেলে লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ যেকোনো সময় লাইসেন্সটি বাতিল, স্থগিত বা রহিত করতে পারবেন- কিন্তু তদারকির অভাবে প্রতিষ্ঠান গুলো বহাল তবিয়তে কার্যক্রম চালাচ্ছে।
তবে মহেশখালীর চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো:
• দক্ষ জনবলের অভাব ও ভুল চিকিৎসা: স্থানীয়দের অভিযোগ হচ্ছে ডায়াগনস্টিক সেন্টার গুলোতে কোনো নিবন্ধিত বা দক্ষ ডিপ্লোমাধারী টেকনোলজিস্ট নেই। আনাড়ি লোক দিয়ে রক্ত, প্রস্রাব বা এক্স-রে পরীক্ষা করানোয় প্রায়ই ভুল রিপোর্ট তৈরি হচ্ছে, যা দেখে চিকিৎসকরা ভুল ওষুধ প্রয়োগ করছেন।
• জরুরি সেবার নামে প্রতারণা: মাতারবাড়ীর মতো দূরবর্তী এলাকায় ১০ শয্যার ক্লিনিক চালানো হলেও সেখানে সার্বক্ষণিক মেডিকেল অফিসার বা জরুরি অপারেশনের জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম অনুপস্থিত, যা স্বাস্থ্য অধ্যাদেশ ও বিএমডিসি আইনের মারাত্মক লঙ্ঘন।
• আইনি জবাবদিহিতার সুযোগহীনতা: অনুমোদনহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ প্রতিষ্ঠানে ভুল চিকিৎসায় রোগী পঙ্গুত্ব বরণ বা মৃত্যুমুখে পতিত হলেও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, কারণ সরকারি সনদে এদের বৈধ অস্তিত্বই নেই।
স্বচ্ছতার অভাব ও আর্থিক শোষণ (শর্ত ৮ লঙ্ঘন)
লাইসেন্সের ৮ নম্বর শর্তানুযায়ী “লাইসেন্সটি প্রতিষ্ঠানের একটি দৃশ্যমান বা প্রধান স্থানে প্রদর্শন করে রাখতে হবে”— যেন রোগীরা বৈধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন। কিন্তু মহেশখালীর অবৈধ ও মেয়াদোত্তীর্ণ সেন্টার গুলো লাইসেন্স ঝুলিয়ে রাখা তো দূরের কথা, মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার যাতায়াত দুর্গমতার সুযোগ নিয়ে দরিদ্র রোগীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো ফি আদায় করে আর্থিক শোষণ চালাচ্ছে।
কর্মকর্তাদের বক্তব্যে চরম অমিল ও প্রশাসনিক স্থবিরতা
নবায়ন না থাকা এবং প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যের অমিলের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: মুহাম্মদ মাহফুজুল হক বলেন, আমার উপজেলার নয়টা বেসরকারি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজি ল্যাব এর মধ্যে একটার লাইসেন্স এখনো প্রক্রিয়াধীন, বাকি আটটার মধ্যে পাঁচটার নবায়ন হয়েছে, বাকি তিনটাকে আমরা সর্তক করেছি, তারা করে ফেলবে জানিয়েছে। কিন্তু অদ্যাবধি নবায়ন করে নাই। আমি গত সপ্তাহেও আমাদের স্বাস্থ্য পরিদর্শককে দিয়ে ফলোআপ করিয়েছি। তবে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের লিখিত নথির সাথে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বক্তব্যে বেশ অসঙ্গতি দেখা গেছে। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সরবরাহকৃত তথ্য মতে উপজেলার ৯টি প্রতিষ্ঠান নবায়নহীন হলেও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: মুহাম্মদ মাহফুজুল হক দাবি করছেন ৫টির নবায়ন হয়েছে।
আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের শিথিলতার বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান মাহমুদ ডালিম জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এবং জেলা সিভিল সার্জন এ বিষয়ে আমাদের সহযোগিতা চাইলে আমরা ম্যাজিস্টেরিয়াল সাপোর্ট দেবো এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করব ও তাদেরকে আইনের আওতায় আনব ।
সচেতন মহলের উদ্বেগ
দ্বীপাঞ্চলের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কেবল নোটিশ পাঠানো বা কারণ দর্শানোর মধ্যেই স্বাস্থ্য বিভাগের ভূমিকা সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয় বলে মনে করেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। তাঁদের মতে, স্বাস্থ্য বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের মধ্যে দ্রুত কার্যকর সমন্বয় করে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ম্যাজিস্টেরিয়াল অভিযান চালোনো প্রয়োজন, যাতে মহেশখালীর মতো প্রান্তিক এলাকার মানুষকে চিকিৎসা সেবার নামে এ ধরনের প্রতারণা ও জীবন ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা যায়।


