জেলা প্রতিনিধি
কক্সবাজার
কক্সবাজারের পাহাড়ি বনে ক্রমেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে এশীয় হাতির রাজত্ব। উখিয়া ও টেকনাফের বনাঞ্চলে বাস করা বিশালকায় এই প্রাণীর সংখ্যা গত এক দশকে আশঙ্কা জনক হারে কমে এসেছে। বন বিভাগ, আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (IUCN) এবং বন্যপ্রাণী গবেষকদের তথ্যে উঠে এসেছে এই মারাত্মক চিত্র।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৫-২০১৬ সালের আইইউসিএন জরিপে সমগ্র কক্সবাজার (উত্তর ও দক্ষিণ বন বিভাগ) জুড়ে প্রায় ৮০ থেকে ৯৫টি মুক্ত এশীয় হাতির বিচরণ ছিল। কিন্তু ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর পরিস্থিতি মারাত্মক ভাবে বদলে যায়। উখিয়া ও টেকনাফে কয়েক হাজার একর বনাঞ্চল ধ্বংস করে আশ্রয় শিবির তৈরি করায় সংকুচিত হয়ে পড়ে হাতির প্রাকৃতিক অভয়াশ্রম। তৎকালীন সময়েই উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলে ৬৭টি হাতি চিহ্নিত হয়, যার মধ্যে অন্তত ৪০টি হাতি নিজ বাস্তুভিটা হারিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চারপাশের বনে আটকা পড়ে।
বর্তমানে (২০২৩-২০২৬) কক্সবাজারের সার্বিক বনাঞ্চলে সব মিলিয়ে ৮০ থেকে ৯৩টি বন্য হাতি বেঁচে থাকলেও দক্ষিণ বন বিভাগে এদের সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ২০-২৫টিতে। বাস্তুচ্যুত হয়ে হাতির একটি বড় অংশ উত্তর বন বিভাগে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছে।
সংকটের মূলে যে কয়টিপ্রধান কারণ আছে বলে মনে করা হয়: ১.আবাসস্থল ও খাদ্যসংকট:- আবাসস্থল ও খাদ্য সংকট এর মূল কারণ হচ্ছে, শরণার্থী শিবিরের জন্য বিশাল বনাঞ্চল উজাড় হওয়ায় প্রাকৃতিক জলাধার ও ছড়া শুকিয়ে গেছে। বন ধ্বংসের ফলে বাঁশ ও কলার গাছের মতো হাতির প্রধান খাবারের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। ২. করিডোর অবরুদ্ধ হওয়া:- আইইউসিএন-এর চিহ্নিত উখিয়া-ঘুমধুমসহ প্রধান আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক হাতির যাতায়াতের পথ গুলো অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন রেললাইন এবং আশ্রয় শিবিরের কারণে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। ৩. সীমান্তে কাঁটাতার ও ল্যান্ডমাইন:- মিয়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া এবং জিরো লাইনে ল্যান্ড মাইন পুঁতে রাখার ফলে বাংলাদেশ-মিয়ানমার মুক্ত চলাচলের আন্তর্জাতিক পথটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ৪. মানুষ-হাতি সংঘাত ও হত্যা:- বাসস্থান ও খাদ্যের সন্ধানে হাতি লোকালয়ে বা ফসলি জমিতে চলে এলে বিদ্যুৎ দিয়ে শর্ট সার্কিট তৈরি, ফাঁদ পাতা এবং বিষ প্রয়োগের মতো নৃশংস উপায়ে হাতি হত্যার ঘটনা ঘটছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন বিভাগের বক্তব্য:
বন বিভাগ: কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের নাম প্রকাশ না করার শর্তে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, বনাঞ্চল সংকুচিত হওয়া এবং হাতি চলাচলের প্রাকৃতিক করিডোর গুলো বন্ধ হয়ে যাওয়াই এই সংকটের প্রধান কারণ। রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরের কারণে উখিয়া ও টেকনাফের একটি বিশাল বনাঞ্চল হাতছাড়া হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে হাতির ওপর। হাতি গুলোকে রক্ষায় আমরা ‘এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম’ (ERT) গঠন ও সচেতনতা মূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। পাশাপাশি হাতির খাদ্যের সংস্থান করতে বনের ভেতরে বাঁশ বাগান ও কলা গাছ রোপণের মতো বিশেষ বনায়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে মানুষ ও হাতির সংঘাত কমাতে করিডোর পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। তবে এই বিষয়ে জানার জন্য কক্সবাজার বন বিভাগ (উত্তর) এর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোঃ মারুফ হোসেন এর ব্যবহৃত ০১৯৯৯—৬৬৬ ও কক্সবাজার বন বিভাগ (দক্ষিণ) বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এর আব্দুল্লাহ-আল-মামুন এর ব্যবহৃত ০১৯৯৯—-০০০ এই নং গুলোেতে প্রতিবেদকের পরিচয় দিয়ে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোন বক্তব্য পাওয়া যায় নাই ।
পরিবেশ অধিদপ্তর:- পরিবেশ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রাকৃতিক বন ধ্বংস ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যহীনতা হাতিকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে। বনের ভেতরের অবৈধ দখল, অবকাঠামো নির্মাণ ও মানব বসতির কারণে হাতির প্রজাতি বিলুপ্তির মুখে পড়ছে। আমরা বনাঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তদারকি বাড়িয়েছি এবং পরিবেশগত ভাবে সংকটাপন্ন এলাকা গুলোতে সব ধরনের অনিয়ম ও বন উজাড় রোধে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের চেষ্টা করছি। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) কক্সবাজার জমির উদ্দিন এর ব্যবহৃত ০১৭৫৯—১৮৭ এবং উপ পরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা এর ব্যবহৃত ০১৮১৫—৩০১ কে এই প্রতিবেদকের পরিচয় দিয়ে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলে ক্ষুদে বার্তা সীন করেও কোন ধরনের মন্তব্য না করা তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয় নাই ।
পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলছেন, সরকারি দফতর গুলোর কেবল জরুরি পদক্ষেপেই এটি সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; আন্তর্জাতিক করিডোর গুলো মুক্ত করা এবং কার্যকর বনাঞ্চল সুরক্ষায় দ্রুত সমন্বিত সমন্বয় না ঘটলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে কক্সবাজারের দক্ষিণ বন বিভাগ থেকে হাতির অস্তিত্ব চিরতরে মুছে যেতে পারে।
পরিবেশবিদরা আরো বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং বনের বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem) টিকিয়ে রাখতে বন্য হাতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাদের কার্যকারিতার কারণে হাতিকে বলা হয় “ইকোসিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার” (Ecosystem Engineer) বা “কী-স্টোন স্পেসিস” (Keystone Species)। হাতি না থাকলে বনের স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হয়ে যাবে এবং বহু ছোট উদ্ভিদ ও প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে। তাই বনের সামগ্রিক ভারসাম্য রক্ষায় বন্য হাতির সুরক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।


