এম কে হাসান, জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার কেবল রূপ-সৌন্দর্যের জন্য নয়, বিশাল ঢেউয়ের রোমাঞ্চ নিতেও প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটককে আকর্ষণ করে। তবে এই নীল জলরাশির ভিড়েই লুকিয়ে থাকে গুপ্ত খাদের টান ও গুপ্ত স্রোতের প্রাণঘাতী ঝুঁকি। গত ১২ বছরে সিআইপিআরবির লাইফগার্ড সদস্যরা সৈকত থেকে ১,০৪৩ জন পর্যটক ও স্থানীয় অধিবাসীকে অলৌকিক ভাবে জীবিত উদ্ধার করেছেন। প্রথম দেখায় এ সংখ্যাটি উদ্ধার কর্মীদের সাহসিকতা ও দক্ষতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেও, পর্যটন খাতের নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির চিত্রটি স্পষ্ট করে তুলে ধরছে।
১,০৪৩ জনকে উদ্ধার: পর্যটনে কতটুকু ঝুঁকি প্রকাশ করে?
১২ বছরে ১,০৪৩ জনকে জীবিত উদ্ধারের পরিসংখ্যানটি মূলত দুটি দিক নির্দেশ করে:-
১. ঝুঁকির তীব্রতা: বছরে গড়ে প্রায় ৮৭ জন কিংবা প্রতি ৪ দিনে ১ জন মানুষ সমুদ্রের ঢেউয়ে ভেসে যাওয়ার মতো মারাত্মক বিপদের মুখোমুখি হচ্ছেন। এটি প্রমাণ করে যে, পর্যাপ্ত আগাম নিরাপত্তা অবকাঠামো ছাড়া সাগরে নামা পর্যটকদের জন্য কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। অসচেতনতা বা অনিরাপদ স্থানে সাগরে নামার এই প্রবণতা কক্সবাজারের পর্যটন ভাবমূর্তির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
২. লাইফ গার্ডের সীমাবদ্ধতা: সিআইপিআরবি ও লাইফ গার্ড ট্রাস্টের সীমিত লোকবল দিয়ে বিপুল সংখ্যক পর্যটককে নজরদারিতে রাখা প্রায় অসম্ভব। বর্তমানে লাইফ গার্ডের ঘাটতির কারণে অনেক পয়েন্টই অরক্ষিত থেকে যাচ্ছে, যা যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করে।
সীনেটিং ও নির্দিষ্ট সুইমিং জোন নির্ধারণের যৌক্তিকতা, সাগরে দুর্ঘটনা রোধে কেবল লাইফ গার্ডের উদ্ধার তৎপরতার ওপর নির্ভর না করে প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। এই ক্ষেত্রে সীনেটিং এবং নির্দিষ্ট সুইমিং জোন নির্ধারণই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান ।
সীনেটিং বা নিরাপত্তা বেষ্টনী সমুদ্রের একটি নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে বিশেষ ফ্লোটিং নেট বা জালি বেষ্টনী তৈরি করে দিলে পর্যটকেরা সাগরের অনিরাপদ বা গভীর অংশে ভেসে যাওয়া থেকে রক্ষা পাবেন। জোয়ার-ভাটার সময় এটি একটি ভৌগোলিক বাধা হিসেবে কাজ করে দুর্ঘটনা বহুলাংশে কমিয়ে আনবে।
জোন ভিত্তিক সুইমিং জোন পুরো সৈকত জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গোসল না করে নির্দিষ্ট নিরাপদ পয়েন্ট চিহ্নিত করে (যেমন: লাবনী, সুগন্ধা বা কলাতলী পয়েন্টের নির্দিষ্ট অংশ) ‘সুইমিং জোন’ ঘোষণা করা প্রয়োজন।
সুবিধা:- নির্ধারিত সুইমিং জোনে লাইফ গার্ডদের উপস্থিতি ও ওয়াচ টাওয়ার কেন্দ্রিক নজরদারি বহুগুণ সহজ হবে। পাশাপাশি বিপজ্জনক খাদ বা গুপ্ত স্রোতযুক্ত পয়েন্ট গুলোকে নো-সুইমিং জোন হিসেবে লাল পতাকা দিয়ে সহজেই চিহ্নিত করা যাবে।
আন্তর্জাতিক পর্যটন মানদণ্ড অনুযায়ী বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় থাইল্যান্ড, বালি বা অস্ট্রেলিয়ার মতো সৈকত গুলোতে সীনেটিং ও ফ্ল্যাগ-ভিত্তিক সুইমিং জোন ব্যবস্থা কঠোর ভাবে মেনে চলা হয়। কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে এই ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি।
২৫ জুলাই বিশ্ব পানিতে ডুবা প্রতিরোধ দিবস ও সার্বিক চিত্র, বিশ্ব পানিতে ডুবা প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে লাবনী পয়েন্টে সিআইপিআরবির ‘সিসেফ’ প্রকল্পের উদ্যোগে প্রদর্শনী ও সচেতনতা মূলক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য রাখেন সিসেফ প্রকল্পের ফিন্যান্স অ্যান্ড অ্যাডমিন অফিসার হাফেজ আহমেদ। তিনি জানান, যুক্তরাজ্যভিত্তিক আরএনএলআই এবং প্রিন্সেস শার্লিন অব মোনাকো ফাউন্ডেশনের সহায়তায় গত ১২ বছরে ১,০৪৩ জনকে উদ্ধারের পাশাপাশি প্রায় ৯ হাজার শিশুকে সাঁতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং ৫০ লাখ পর্যটককে সচেতন করা হয়েছে।
কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পকে নিরাপদ ও সমৃদ্ধ করতে সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে সৈকতে লাইফ গার্ডের সংখ্যা বাড়ানো, ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে সীনেটিং স্থাপন এবং অবিলম্বে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নির্দিষ্ট সুইমিং জোন বাস্তবায়ন করা আবশ্যক। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে কক্সবাজার আরও বেশি আস্থাভাজন ও আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।


