অনুসন্ধান প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ড. মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম মজুমদারের বিরুদ্ধে লাগামহীন দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের পাহাড় সমান অভিযোগ উঠেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সম্প্রতি একাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত প্রকল্প পরিচালককে পরিবর্তনের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ে তালিকা প্রেরণের পর কিছু পিডিকে পরিবর্তন করা হলেও, এখনো বহাল তবিয়তে ও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন ড. মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম মজুমদার।
তাঁর নেতৃত্বে চলমান নানা অনিয়মের কারণে প্রকল্পের আওতাভুক্ত সকল উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণের বিপরীতে কাগজে-কলমে বরাদ্দ দেখানো হলেও বাস্তবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কৃষকদের কোনো অর্থ প্রদান করা হয় না।
সমূদয় টাকা আত্মসাৎ করছেন পিডি নিজেই। কৃষি যন্ত্রপাতি ও পণ্যসামগ্রী কেনাকাটার নামেও চলছে হরিলুট। বিশেষ করে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে কিশোরগঞ্জ ও নিকলীসহ ঢাকা অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় আধুনিক, লাভজনক ও টেকসই কৃষি উৎপাদন এবং বাণিজ্যিক ও রপ্তানিযোগ্য ফসল উৎপাদনে কৃষকদের যে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ছিল, তা নামমাত্র আয়োজন করা হয়েছে।
হাতে গোনা কয়েকজন কৃষককে এনে নামমাত্র একটি প্যাকেটজাত খাবার ধরিয়ে দিয়েই সমাপ্ত করা হয় প্রশিক্ষণ। অথচ প্রশিক্ষণের নামে বরাদ্দের সিংহভাগ টাকাই লুটপাট করা হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের বরাদ্দের টাকা ফেরত দিতে চাপ প্রয়োগ করে তা আত্মসাৎ করার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অফিসে মালামাল ক্রয় সংক্রান্ত কারচুপি, ডিপিপির বাইরে নিয়মবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত খরচ দেখানো এবং ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
কৃষি সহায়তার অংশ হিসেবে কৃষকদের মাঝে সার, অতি নিম্নমানের বীজ ও আধুনিক কৃষি উপকরণ বিতরণেও ব্যাপক দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের তদারকির কাজ ধীরগতিতে চলায় এবং পিডির আর্থিক দুর্নীতির কারণে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। খামারবাড়ি ও এর আওতাধীন বিভিন্ন প্রকল্পে এর আগে নানা অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও ড. আবদুল কাইয়ুম মজুমদার এখনো অক্ষত রয়েছেন।
বিগত বিভিন্ন ঘটনার উদাহরণ টেনে সংশ্লিষ্টরা জানান, এর আগে ঢাকার শ্যামপুরে অবস্থিত কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউজ ল্যাবরেটরি আধুনিকায়ন প্রকল্পে কাজ শুরুর আগেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অনিয়ম করে প্রায় ১৬ কোটি টাকা অগ্রিম ছাড় করার প্রমাণ পেয়েছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), এবং মামলা দায়েরের আগেই সেই পিডিকে সরানো হয়েছিল।
এ ছাড়া কৃষি যান্ত্রিকীকরণসহ প্রায় ৪০ হাজার কৃষিযন্ত্র বিতরণ ও কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম অভিযান পরিচালনা করে এবং অনিয়মের অভিযোগে সাবেক মহাপরিচালক বেনজির আলমের পেনশন সুবিধা স্থগিত হয়।
ই-টেন্ডার প্রদান নিয়ে ঠিকাদার কর্তৃক প্রকল্প পরিচালককে হুমকি ও লাঞ্ছিত করার ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচিত হয়েছে। এসবের পাশাপাশি ভুয়া বিল-ভাউচার এবং প্রণোদনার অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্য চরম আকার ধারণ করেছে।
চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের ২৩ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলায় ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দিনব্যাপী কৃষক-কৃষাণীদের প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়।
কৃষকদের আধুনিক ও টেকসই কৃষি উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করার কথা থাকলেও, এই প্রশিক্ষণের বিপরীতে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হলো কৃষিকে শুধু খাদ্য উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাণিজ্যিক ও রপ্তানিমুখী কৃষিতে রূপান্তরের মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক ফসল নির্বাচন, উন্নত জাত ও মানসম্মত বীজ ব্যবহার, আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি, সুষম সার ব্যবস্থাপনা, রোগ ও পোকা দমন, নিরাপদ কৃষি উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণের কলাকৌশল কৃষকদের শিখিয়ে মাঠপর্যায়ে তার প্রয়োগ ঘটানো।
কিন্তু পিডির দুর্নীতির কারণে রপ্তানিযোগ্য ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য, পণ্যের গুণগত মান, অবশিষ্টাংশমুক্ত উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা পূরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আজ চরম বেহাল দশায় পড়েছে।
কৃষকদের চাহিদাভিত্তিক ও রপ্তানিমুখী উৎপাদনে উৎসাহিত করার যে মহৎ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা আজও আলোর মুখ দেখেনি।
উক্ত অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের পিডি ড. মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম মজুমদারের মোবাইলে ফোন করে তাঁর বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান যে, তাঁর প্রকল্পের বিষয়ে কোনো মন্তব্য নিতে হলে তাঁকে সরাসরি অফিসে গিয়ে সাক্ষাৎ করতে হবে।


