মোঃ শাহজালাল, বরগুনা।।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা বলেছেন, বিএনপি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে পাঁচ বছর ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভবিষ্যতে বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন না এবং তাঁর কবরও বাংলার মাটিতে হবে না বলে মন্তব্য করেছেন তারা।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে বরগুনা শহরের স্থানীয় হোটেল বে অব বেঙ্গল রেস্টুরেন্টে আয়োজিত সমাবেশ শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে এনসিপির নেতৃবৃন্দ এসব কথা বলেন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আল নাহিয়ান, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, কেন্দ্রীয় সংগঠক মহিউদ্দিন রনি, কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক গোলাম সরোয়ার তুষার এবং বরিশাল অঞ্চলের বিভাগীয় সংগঠক অ্যাডভোকেট মুজাহিদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা বলেন, বর্তমানে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচির মূল লক্ষ্য সরকার পতন নয়। গত ছয় মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন ভুল, সিদ্ধান্তের অসঙ্গতি ও ব্যর্থতা জনগণের সামনে তুলে ধরাই লং মার্চসহ চলমান কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য। সরকারের কর্মকাণ্ডে কোথায় ভুল হয়েছে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, তা তুলে ধরে সরকারকে সতর্ক করতেই এসব কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বলে জানান তারা।
এনসিপি নেতারা বলেন, জনগণের স্বার্থে গঠিত কোনো সরকারই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। জনগণের দুর্ভোগ কমানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এসব ক্ষেত্রে ব্যর্থতা দেখা দিলে জনগণের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক বলেও তারা মন্তব্য করেন।
লং মার্চ প্রসঙ্গে নেতারা বলেন, ‘লং মার্চ সরকার পতনের আন্দোলন নয়; গত ছয় মাসে সরকার যে ভুলগুলো করেছে, সেগুলো জাতির সামনে উপস্থাপন করার জন্যই এই কর্মসূচি।’
তাদের দাবি, জনগণের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা আশ্বাস দিয়ে এসব সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সরকারকে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।
বক্তারা জানান, সাম্প্রতিক লং মার্চ কর্মসূচিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি সামনে এসেছে। এর মধ্যে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাইয়ের দাবিগুলো বাস্তবায়ন ও জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-গ্যাস-জ্বালানি ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধের বিষয়গুলো রয়েছে।
তারা বলেন, এসব দাবি কোনো রাজনৈতিক দলের একক দাবি নয়, বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই সরকারকে এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
প্রেস ব্রিফিংয়ে বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও কঠোর মন্তব্য করেন এনসিপির নেতারা। তারা বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে পাঁচ বছর ক্ষমতায় টিকে থাকা তাদের জন্য কঠিন হবে।
নেতারা বলেন, ক্ষমতায় থাকা কোনো রাজনৈতিক দলের স্থায়ী অধিকার নয়। জনগণের আস্থা অর্জন করতে না পারলে জনগণই তার জবাব দেবে। বিএনপি সরকারের কর্মকাণ্ডে যদি সাধারণ মানুষ হতাশ হয়, তাহলে রাজনৈতিকভাবে তার প্রভাব পড়বে বলেও তারা মন্তব্য করেন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়েও কঠোর বক্তব্য দেন এনসিপির নেতারা।
তারা বলেন, শেখ হাসিনা আর কোনোদিন বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন না। এমনকি তাঁর কবরও বাংলার মাটিতে হবে না বলে মন্তব্য করেন তারা।
শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে নেতারা বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতীতের মতো কোনো একক ব্যক্তি বা দলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই। জনগণের ভোটাধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর তারা গুরুত্বারোপ করেন।
এনসিপি নেতাবৃন্দ বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেষ কথা বলবে জনগণ। কোনো রাজনৈতিক দলই চিরস্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থাকার নিশ্চয়তা নিয়ে রাজনীতি করতে পারে না। জনগণের ভোট, অধিকার ও প্রত্যাশার প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়বদ্ধ থাকতে হবে।
তাদের ভাষ্য, ক্ষমতায় গিয়ে কোনো দল যদি জনগণের মৌলিক সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে জনগণ পরবর্তী সময়ে তার রাজনৈতিক জবাব দিবে।
বক্তারা আরও বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির মতো বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে। এসব সমস্যাকে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে রেখে বাস্তব সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
এনসিপি নেতারা বলেন, সরকার যদি জনগণের দাবি ও প্রত্যাশার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব না দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক কর্মসূচি আরও কঠোর হতে পারে। তবে বর্তমান কর্মসূচির উদ্দেশ্য সরকারকে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষমতা থেকে সরানো নয়, বরং সরকারের ভুল-ত্রুটি ও জনদুর্ভোগের বিষয়গুলো সামনে এনে প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুযোগ তৈরি করা।
তারা বলেন, জনগণের স্বার্থে সরকারকে ভুল সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বরগুনায় আয়োজিত এ সমাবেশ ও প্রেস ব্রিফিংয়ে এনসিপির স্থানীয় নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন। বক্তাদের বক্তব্যে একদিকে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা, অন্যদিকে বিএনপির সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সরকার নিয়ে সতর্কবার্তা এবং আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে ঘিরে কঠোর রাজনৈতিক অবস্থান উঠে আসে।
মোঃ শাহজালাল
বরগুনা


