নিজস্ব প্রতিবেদক
টানা রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত ও বিরূপ আবহাওয়ার কারণে যশোর জেলার ৮টি উপজেলা এখন ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। বিশেষ করে অভয়নগর, মণিরামপুর, কেশবপুর ও অভিশপ্ত ভবদহ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকের ধানের বীজতলা, সবজিক্ষেত এবং শত শত মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে করে জেলার লাখো মানুষ পানিবন্দী হয়ে তীব্র মানবিক সংকটের মুখে পড়েছেন।
এই চরম উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রবিবার (১২ জুলাই) সকালে যশোর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান।
সভায় জেলা প্রশাসক জানান, জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে গত দুই দিনে যশোরে রেকর্ড ১৯৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ভবদহ অঞ্চলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে ২৭ টন চাল জরুরি ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য সকল উপজেলায় দ্রুত ত্রাণ পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত জেলার সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) সার্বক্ষণিক মাঠপর্যায়ে থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে থাকার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে জেলাজুড়ে বিষধর সাপের উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সভায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এ বিষয়ে যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা জানান, বর্তমানে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি করে অ্যান্টিভেনম মজুদ রয়েছে। তবে জেলা প্রশাসক উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিটি হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে অন্তত সাতটি করে অ্যান্টিভেনম মজুদ নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।
এদিকে, সভায় বিগত জুন মাসের জেলার সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। সার্বিক পরিস্থিতি সন্তোষজনক হলেও সাম্প্রতিক সময়ে জেলায় খুন, ডাকাতি, ছিনতাই ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধের গ্রাফ কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বিশেষ করে উঠতি বয়সী কিশোর গ্যাং, মাদক কারবারি ও চোরাচালানিদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।
মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য দমনে সভায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— অপরাধীদের তথ্য পেতে জেলা প্রশাসনের অধীনে একটি গোপন হটলাইন নম্বর চালু করা, সীমান্ত এলাকায় বিজিবি ও পুলিশের সমন্বয়ে যৌথ চিরুনি অভিযান অব্যাহত রাখা, যশোর শহরে অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও তীব্র যানজট নিরসনে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা অভিযান পরিচালনা করা এবং আগামী ১৬ জুলাই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা উৎসব উপলক্ষে জেলাজুড়ে বিশেষ ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
উক্ত গুরুত্বপূর্ণ জরুরি সভায় অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন যশোর জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন, পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম, স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক ও পৌর প্রশাসক সৈয়দ রফিকুল হাসান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সুজন সরকার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কমলেশ মজুমদারসহ জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধিবৃন্দ।


