জেলা প্রতিনিধি বান্দরবান :
হাসপাতাল মানেই মানুষের শেষ ভরসার জায়গা। অসুস্থ শরীর, চোখে-মুখে উৎকণ্ঠা আর সুস্থ হয়ে ঘরে ফেরার আকুতি নিয়ে মানুষ ছুটে আসেন চিকিৎসার আশায়। কিন্তু সেই হাসপাতালেই যদি একটি শয্যার অভাবে অসুস্থ রোগীকে মেঝেতে রাত কাটাতে হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—স্বাস্থ্যসেবার এই চিত্র কতটা মানবিক?
বান্দরবানের লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে এমনই এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির দেখা মিলছে। প্রয়োজনের তুলনায় শয্যা কম থাকায় অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। সোমবার (১৭ আগস্ট) সন্ধ্যায় সরেজমিনে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে দেখা যায়, শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ রোগীদের কেউ মেঝেতে বসে, আবার কেউ শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
অসুস্থ শরীর নিয়ে মেঝেতে শুয়ে থাকা রোগীদের পাশে স্বজনদের উৎকণ্ঠিত মুখ—পুরো পরিবেশটিই যেন বলে দিচ্ছে, একটি শয্যার জন্য কতটা অসহায় হয়ে পড়েছেন তাঁরা। কোথাও মেঝেতে বিছানা পেতে রোগীর অবস্থান, কোথাও স্বজনের কোলে শিশু—চিকিৎসার পাশাপাশি এমন পরিবেশে রোগী ও স্বজনদের পোহাতে হচ্ছে বাড়তি কষ্ট।
স্থানীয়দের ভাষ্য, লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স শুধু লামা শহর বা উপজেলার মানুষের জন্য নয়; দুর্গম পাহাড়ি এলাকার অসংখ্য মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল। যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক দরিদ্র ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ এই হাসপাতালের ওপরই নির্ভরশীল। ফলে রোগীর চাপ প্রায়ই সামর্থ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়।
এক রোগীর স্বজন আক্ষেপ করে বলেন, “অসুস্থ মানুষকে সুস্থ হওয়ার আশায় হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। কিন্তু একটি শয্যা না পেয়ে মেঝেতে থাকতে হচ্ছে। রাতে শিশু ও বয়স্ক রোগীদের নিয়ে এই অবস্থায় থাকা খুবই কষ্টের।”
সচেতন মহলের মতে, চিকিৎসাসেবা শুধু ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন রোগীর জন্য নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করাও চিকিৎসাসেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্ক রোগীদের মেঝেতে চিকিৎসা নেওয়ার পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, লামা উপজেলার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও রোগীর চাপ বিবেচনায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সম্প্রসারণ, রোগী ও স্বজনদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে। কারণ একজন অসুস্থ মানুষ হাসপাতালে আসেন সুস্থতার আশায়—অতিরিক্ত কোনো সুবিধা কিংবা অনুগ্রহের জন্য নয়। একটি শয্যা হয়তো হাসপাতালের কাছে কেবল একটি সংখ্যা, কিন্তু অসহায় রোগীর কাছে সেটিই হতে পারে নিরাপদে বেঁচে থাকার আশ্রয়।
লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শয্যা সংকটের এই চিত্র তাই শুধু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার বিষয় নয়; এটি মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।


