এবিএম আতিকুর রহমান বাশার:
১ টাকা ৫৬ পয়সা পুঁজি নিয়ে হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিকই নন, যিনি নিমসার জুনাব আলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, নিমসার গার্লস স্কুল (বুড়িচং এরশাদ ডিগ্রিকলেজ প্রতিষ্ঠাতেও তাঁর বড়অবদান রাখা।)প্রতিষ্ঠাসহ জনকল্যাণ মূলক অসংখ্য সামাজিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।
তিনি অত্যন্ত ধার্মিক এবং মানবদরদী একজন মানুষ ছিলেন। তিনি নিজে আর্থিক সংকটে লেখাপড়া না করতে পারলেও নিজ গ্রামের ও এলাকার সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কথা চিন্তা করে শিক্ষার প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
নিজ হাতে তিলে তিলে ব্যবসা গড়ে তুলে তিনি অসামান্য সাফল্য অর্জন করেন এবং অর্জিত সম্পদের বড় একটি অংশ শিক্ষা প্রসারে আর্থ- সামাজিক উন্নয়ন অবকাঠামো নির্মাণ, সমাজ সেবায় ব্যয় করেন।
১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারি তার প্রতিষ্ঠিত কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার নিমসার জুনাব আলী কলেজ (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ)
নিমসার জুনাব আলী কলেজটি পরবর্তীতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক (পাস) ও অনার্স কোর্স চালু করা হয়। কলেজটি বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত এবং বাংলা, ইংরেজি, সমাজকর্ম, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, হিসাববিজ্ঞান ও ফিন্যান্সসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু রয়েছে।
শিক্ষানুরাগী ও দানবীর আলহাজ্ব জুনাব আলী নিজ এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়াতে এই কলেজটি গড়ে তোলেন।
আমরা এ প্রজন্মের অনেকেই ওই মানুষটাকে চিনিনা। যারা চিনি তাদের অনেকের কাছেই আবছা- ঝাপসা হয়ে আছেন। তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন,- কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার নিমসার গ্রামের হত দরিদ্র শেখ চারু মিয়ার ছেলে দানবীর আলহাজ্ব মোহাম্মদ জুনাব আলী সাহেব।
তিনি লেখাপড়া খুব একটা জানতেন না। মক্তবে প্রথম শ্রণী পর্যন্ত পড়ার পর দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ানোর সামর্থ ছিলনা তার বাবার।
তিনি ১৯১৬ সালে কুমিল্লা জেলার নিমসার গ্রামে এক হত দরিদ্র কৃষক বাবার ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম শেখ চারু মিয়া একজন সাধারন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর নিজস্ব জমিজমা বলতে কিছুই ছিলনা। পরের ঘরে কাজ করে ও বর্গা জমি চাষ করে খেতেন।পরে ঠিকাদারি ব্যাবসায়ও যুক্ত হয়েছিলেন। জুনাব আলীর পিতা শেখ চারু মিয়া অধিকাংশ সময় সংসার খরচের জন্য নিকট আত্মীয়স্বজনদের কাছে সাহায্যের জন্য ধরনা দিতে হতো। এভাবে আর্থিক অনটনের মধ্যে জীবনযাপনের একসময় শেখ চারু মিয়া ১৯৪৪ সালে ৮২ বছর বয়সে তাঁর নিজ গ্রামে ইন্তিকাল করেন।
আলহাজ্ব মোহাম্মাদ জুনাব আলী তাঁর কর্মগুণে আজ ব্যবসায়ীদের নিকট আদর্শ ও প্রেরণার জ্বলন্ত উদাহরণ। তিনি প্রমাণ করে গেছেন পরিশ্রম ও প্রচেষ্টার কাছে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। তার একনিষ্টতা, সততা, পরিশ্রম তাঁকে এ শীর্ষ অবস্থানে এনেছে। তিনি নামমাত্র পুঁজি নিয়ে ব্যবসায়ের মাধ্যমে অগাধ সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। তার এই কর্মকান্ড সৃজনশীল উদ্যোক্তা দেরকে উদ্যোগ কার্যক্রমে ব্যাপক অনুপ্রাণিত করবে।
আলহাজ্ব জুনাব আলীর কর্মজীবনের কাহিনী অন্যান্য ব্যবসায়ীর জীবন বৃত্তান্ত থেকে কিছুটা ভিন্ন আঙ্গিকের। তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজ গ্রামের মক্তবে। এক বছর পর তিনি যখন প্রথম থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উত্তীন হন, তখন পিতার নিকট নতুন বই কেনার জন্য কিছু টাকা চান।
কিন্তু তাঁর পিতা টাকা না দিতে পারায় ঘরে চাল যা ছিল সব বিক্রি করে এক টাকা ৫৬ পয়সা পেলেন এবং তা নিয়েই বাড়ী ত্যাগ করলেন এবং মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন যে পর্যন্ত নিজে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারবেন এবং বাবা-মার ভরন পোষণের ব্যবস্থা করতে না পারবেন সে পর্যন্ত বাড়ি ফিরবেন না। সেই এক টাকা ৫৬ পয়সাই ছিল তাঁর বাস্তব জীবনের সোপান।
ঘটনাবহুল ব্যবসায়িক জীবনে তিনি এক টাকা ৫৬ পয়সা দিয়ে তরিতরকারী বিক্রয় করতে শুরু করেন। সুদীর্ঘ বারো বছর তিনি এ ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। এ ব্যবসায় থেকেই ক্রমান্বয়ে সঞ্চিত মূলধন তিন হাজার উন্নিত করলেন এবং তা দিয়ে কুমিল্লা জেলার পশ্চিমে ময়নামতি বাজারে একটি বড় আকারের মনিহারি দোকান দিলেন।
তিনি অত্যন্ত সাদামাঠা জীবন যাপন করতেন। কুমিল্লা শহর থেকে মাথায় বোঝা নিয়ে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে ময়নামতি, নিমসার এলাকায় যাতায়ত করতেন। রিক্সায় কখনো চড়তেন না।
আমাদের ছোট বেলায় খেলাধূলার জন্য চাঁদা নিতে আসলে (৭০ এর দশকে) এক আনা দুই আনার বেশী দিতেন না। তাই আমরা ওনাকে কিপটা বলে আখ্যা দিতাম। তার চেয়ে উদার ছিলেন মনোহরপুরের পরেশ বাবু, তিনি চার আনার নিতে কখনো দিতেন না।
তার জীবনের ইতিহাসটা ছিল অন্যদের চেয়ে একটু ভিন্ন। তার জীবনের দ্বিতীয় উত্থানের ধাপটি ছিল আরো তমৎকার। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ঘাঁটিছিল ময়নামতি। জুনাব আলী যুদ্ধ চলাকালিন সেনা নিবাসে নিয়মিত চাল, ডাল, তেল ইত্যাদি সরবরাহের কন্ট্রাক্ট পান এবং তা থেকে প্রায় বিশ হাজার টাকা উপার্জন করেন।
১৯৪৫ সালে যুদ্ধ যখন শেষপর্যায়ে সেই সময় তিনি এ টাকা দিয়ে কুমিল্লা শহরের ব্যস্ততম এলাকা শাসনগাছায় একটি বড় আকারের মনিহারি দোকান দেন। শাসনগাছায় তখন মাত্র দুটি দোকান থাকার কারণে তার ব্যবসায় ছিল খুবই জমজমাট। কিছুদিন পর তিনি দোকান থেকে মুলধন উঠিয়ে কুমিল্লা দাউদকান্দি বুটে ‘সোনার বাংলা’ এবং ‘গ্রীন এ্যারো’ নামক বিশ হাজার টাকা মূল্যের দুটি বাস চালু করেন।
একাধিক পণ্য নিয়ে ব্যবসায় পরিচালনা করলে স্থায়ী ব্যয় কম হবে ভেবে তিনি ১৯৫০ সালে তাঁর শামনগাছায় দোকানের নামে তৎকালীন পাকিস্তান টোবাকো কোম্পানির কুমিল্লা জেলার একমাত্র পরিবেশক হন। ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায় লাভজনক ছিল বলে তিনি এ ব্যবসায়েও মূলধন নিয়োগ করেন এবং প্রায় প্রতি বছরই দু একটি করে বাস বা ট্রাক ক্রয় করতেন এ ব্যবসায়ের প্রয়োজনীয় মূলধনের ৩০% তিনি জনতা ব্যাংক থেকে গ্রহন করতেন। এ সময়ে তিনি কুমিল্লা শহরের আবাসিক এলাকা অশোকতলা এবং কান্দিরপাড়ে দুটি হিন্দু জমিদারের বাড়ি ক্রয় করেন। তাছাড়া ১৯৪৭ সালে অনেক হিন্দুই দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় জুনাব আলী তাদের জমি ধন সম্পত্তি ক্রয় করে সম্পদশালী হন। জুনাব আলী নিজে রেইস কোর্স এলাকায় একটি খালি জায়গা ক্রয় করে বাড়ি করেন। এ সময় এ জমিতে তাঁর ট্রান্সপোর্টের তত্ত্বাবধানের জন্য পুত্র নুরল ইসলামের নামে নুর ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কসপ স্থাপন করেন। ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত তার মোট বাস সংখ্যা দাঁড়ায় ৭০টিতে এবং এ ব্যবসায় তাঁর প্রায় দুশো শ্রমিক নিয়োজিত ছিল।
ইতোমধ্যে গ্রামের রাজনীতিতে জুনাব আলী ক্রমশ জড়িয়ে পড়েন। সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে তৎকালীন কৃষক-শ্রমিক আওয়ামীলীগের তিনি একজন সমর্থক থাকায় জুনাব আলী স্থানীয় প্রতিনিধি নির্বাচনেই জয়লাভ করতেন এবং প্রায় একটানা ৩০ বছর যাবৎ ইউনিয়ন বোর্ডের কখনও মেম্বার বা কখনো প্রেসিডেন্ট ছিলেন। রাজনৈতিক কারণেই ১৯৫৮ সালে তাঁকে নিজ বাসভবন থেকে গ্রেফতার করা হয় এবং সাত দিন কারাবরণ করতে হয়।
১৯৬২ সালে জুনাব আলী খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে আলুর বীজ আমদানির একটি লাইসেন্স সংগ্রহ করেন। আমদানি ব্যবসায় শুরুর পর থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে মূলধন প্রায় ২৫/৩০ লাখ টাকায় উন্নীত করেন। ১৯৬৮ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি খাদ্য মন্ত্রনালয়ের অধীনে খাদ্য পরিবহন ঠিকাদার নিযুক্ত ছিলেন। আবার এসময়ে চট্টগ্রাম বিভাগের পাকিস্তান টোবাকো কোম্পানির ঠিকাদারও ছিলেন। চট্টগ্রাম থাকা কালীন ১৯৬৮ সালে ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা আগ্রাবাদে এক বিঘার একটি খালি জায়গা ক্রয় করেন এবং ব্যবসায়িক কাজকর্মের সুবিধার জন্য সেখানে একটি বাড়ি নির্মাণ করেন।
বার্মা ইস্টাণের এজেন্সি নিয়ে ১৯৭০ সালে ঢাকা- চট্টগ্রাম সড়কের পাশে ময়নামতিতে ৫ বিঘা জমির উপর ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি পেট্রোল পাম্প স্থাপন করেন। হাজি জুনাব আলী ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শহর ছেড়ে নিজ গ্রামে ফিরে যান এবং সেখানে ১ বছর সময় অতিবাহিত করেন। যুদ্ধ চলাকালিন সময়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাঁর প্রায় ২০/৩০টি বাস ট্রাক ধ্বংস করে দেয়। বাকি বাস ও ট্রাক তাঁর কেন্দ্রিয় ওয়ার্কশপে বন্ধ রেখে তিনি সে সময়ে গ্রামের জমিজমার দিকে মনোনিবেশ করেন এবং অল্প সময়ের ভেতরে চাষের উপযোগী জমির পরিমান বৃদ্ধি করেন। সরকার ১৯৭২ সালে আলু আমদানি সরকারী নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসে।
সরকারের এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে জুনাব আলী ১৯৭২ সালে জানুয়ারী মাসে আলু গুদামজাত করার জন্য পঞ্চাশ হাজার মণ আলু রাখার ক্ষমতাসম্পন্ন একটি হিমাগার স্থাপন করেন। এখানে লক্ষণীয় বিষয় জুনাব আলী সুযোগ বুঝে বহু নতুন ব্যবসায় বা শিল্প বিনিয়োগ করেছেন এবং অলাভজনক মনে হলে পুরাতন কাজ ধীরে ধীরে পরিত্যাগ করেছেন। বেতকা হিমাগার শিল্পে মোট ব্যয় হয় ২০ লাখ টাকা, তাঁর নিজস্ব বিনিয়োগ ৬ লাখ টাকা এবং ১৪ লাখ টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন।
জনাব আলী ১৯৭৪ সালে মুন্সিগঞ্জের কমলাঘাট ‘প্রজেক্ট’ ট্রেডিং স্টোরেজ লিমিটেডের শতকরা ৬০ ভাগ শেয়ার ক্রয় করেন এবং নগদ ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। এছাড়া জুনাব আলী ১৯৭৬ সালে কুমিলা শহর থেক দক্ষিন-পূর্ব কোণে শামস কোল্ড স্টোরেজ লিঃ এর শতকরা ৫০ ভাগ শেয়ার ১৮ লাখ টাকার বিনিময়ে ক্রয় করেন। ব্যাংকের সহায়তায় আবার ১৯৭৮ সালে মুন্সিগঞ্জের বেতকায় জামাল আইস এন্ড কোল্ড সোটারেজ লিঃ এ ৩৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। এর দুই তৃতীয়াংশ অর্থ জুনাব আলীর ছিল। কুমিল- শহরের সাত মাইল পশ্চিমে কাবিলী নামক স্থানে একটি ব্রিকফিল্ডও স্থাপন করেন। ব্রিকফিল্ড ইট মূলত তাঁর নিজের র্নিমাণ কাজেই ব্যবহার করা হয়।
তিনি ১৯৬২ সালে ঢাকার মালিবাগে ৫ কাঠা জমির উপর একটি দোতলা বাড়ি নির্মাণ করেন। জুনাব আলী মালিবাগ ডি আই টি রোডের পাশে ৮ কাঠা জমির উপর স মিলস স্থাপনকরে কাঠের ব্যবসায় শুরু করেন। এছাড়া ১৯৭৫সালে ঢাকার খিলগাঁয়ে চার কাঠার একখন্ড জমি ক্রয় করেন।
জুনাব আলী আরও একটি হিমাগার ১৯৮০ সালে কুমিল্লা শহর থেকে ৮ মাইল পশ্চিমে মোকাস নামক স্থানে ১ লাখ মণ আলু রাখার ক্ষমতাসম্পন্ন ‘মোকাস স্টোরেজ লিঃ’ নামে প্রতিষ্টা করেন। বিভিন্ন হিমাগারে ১০০ জন লোকের কর্মসংস্থান হয় এবং এখানে তাঁর নিজস্ব বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৫০ লাখ টাকা। বাঁকি ৫০ লাখ টাকা তিনি ব্যাংক থেকে ঋণ নেন এবং প্রধান ব্যবসায়িক হিসেবে সাফল্য মূলত হিমাগার স্থাপনের মাধ্যমেই অর্জিত হয়।
(চলমান)


