মো: হেলাল রহমান
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই গ্রামের আকাশ এখন কুয়াশায় ঢেকে যায়। মায়ার মতো দুলতে থাকা সাদা কুয়াশা সকাল গড়িয়ে দুপুর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এর মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষকে দূর থেকে কেবল অস্পষ্ট ছায়া বলে মনে হয়। উত্তরাঞ্চলের গ্রামগুলোতে শীতের এই কুয়াশা যেন নিঃশব্দে মানুষের জীবনে বাড়তি দুর্ভোগ নিয়ে এসেছে।
এই শীতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুররা। কৃষিকাজ, নির্মাণ, ইটভাটা—সব জায়গাতেই কাজ শুরু হচ্ছে দেরিতে।
ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত ঘন কুয়াশায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে মাঠ-ঘাট, শহরের রাস্তাঘাট, এমনকি গ্রামীণ জনপদও। দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় যানবাহনগুলোকে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
নীলফামারী জেলার গ্রামের দিনমজুর রুবেল ইসলাম বলেন,
“আগে সকাল সাতটায় কাজ শুরু হতো। এখন দশটার আগে কাজই মেলে না। দিন ছোট হয়ে গেছে—মজুরিও কমে যাচ্ছে।”
দিনমজুরদের দৈনিক আয়ের ওপর তাদের পরিবারের পুরো মাসের ব্যয় নির্ভর করে। শীতের দীর্ঘ কুয়াশার কারণে কাজ কমে যাওয়ায় অনেকেই ধারদেনা করে চলছেন। কেউ কেউ আবার শহরে গিয়ে কাজ খোঁজার চেষ্টা করছেন।
গ্রামের কৃষকরা বলছেন, “কুয়াশার তীব্রতা কৃষিকাজকে মারাত্মক প্রভাবিত করছে। ধান ও সবজির ওপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি জমে থাকার ফলে পাতায় রোগের আশঙ্কা বাড়ছে।”
কৃষক রোস্তম আলী বলেন,“মাঠে গেলে পোশাক ভিজে যায় কুয়াশায়। চারা ভেজা থাকলে পচে যায়। আবার রোপণ করলে খরচ কর্মজীবী মানুষ এ খরচ বহন করবে কীভাবে?”
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, “তীব্র কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহে বোরো ধানের উৎপাদন ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমার ঝুঁকি রয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন ক্ষুদ্র কৃষকেরা।”
শীতের কুয়াশায় বাতাসের আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় শ্বাসকষ্ট, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া-এসব রোগ বাড়ছে।
গ্রামাঞ্চলের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে প্রতিদিনই নতুন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী ফারজানা খাতুন বলেন,
“বিশেষ করে শিশু আর বয়স্করা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। ওষুধের জন্য লাইন ধরতে হচ্ছে। অনেকেই ঠান্ডায় কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন।”
দিনমজুরদের মধ্যে অনেকেই যথাযথ শীতবস্ত্র না থাকায় খড়কুটো, পুরোনো কম্বল বা প্লাস্টিক দিয়ে ঠান্ডা ঠেকানোর চেষ্টা করছেন।
গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি সংগঠন শীতবস্ত্র বিতরণ শুরু করলেও তা পর্যাপ্ত নয়। অনেক পরিবারই সাহায্য না পেয়ে কষ্টে রাত কাটাচ্ছেন।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক তুহিন হোসেন বলেন,
“আমরা কম্বল দিচ্ছি, কিন্তু চাহিদা এত বেশি যে সবার কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। শিশুরা কাঁপছে—বয়স্কদের অবস্থা আরও খারাপ।”
আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, জানুয়ারিতে আরও কয়েক দফা শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এতে কুয়াশার স্থায়িত্ব আরও বাড়বে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দিনমজুর, ক্ষুদ্র কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতের মৌসুমে—
কর্মসংস্থান বৃদ্ধি,জরুরি শীতবস্ত্র সহায়তা ও কৃষকদের প্রযুক্তিগত পরামর্শ দ্রুত নিশ্চিত করা জরুরি।
কুয়াশার সকাল যত ঘনীভূত হয়, ততই গ্রামের দিনমজুরদের কষ্ট আরও স্পষ্ট হয়। জীবিকা থেমে নেই, থেমে নেই সংগ্রামও।
প্রতিদিন শীতকে জয় করার চেষ্টা করেই তারা নতুন দিনের সূচনা করেন।
মো: হেলাল রহমান
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর



