মুজাহিদ হোসেন, নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি:
দীর্ঘ প্রায় ২৭ বছরেও এমপিওভুক্ত না হওয়ায় নওগাঁর মান্দা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গাড়ীক্ষেত্র ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসা আজ অস্তিত্ব সংকটে। একসময় শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে তীব্র আর্থিক সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং সরকারি সহায়তার অভাবে ধীরে ধীরে প্রাণহীন হয়ে পড়ছে। শিক্ষকরা বছরের পর বছর বেতন-ভাতা ছাড়াই পাঠদান করে প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে গেলেও পরিস্থিতি দিন দিন আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাটি ২০০২ সালে একাডেমিক স্বীকৃতি লাভ করে এবং ২০০৪ সাল থেকে শিক্ষার্থীরা দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে আসছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি এলাকার পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো এমপিওভুক্ত না হওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারীরা কোনো সরকারি বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না।
বর্তমানে মাদরাসাটিতে ১৬ জন শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। জীবিকার তাগিদে অনেকেই পাঠদানের পাশাপাশি দর্জির কাজ, কৃষিকাজ, দিনমজুরি কিংবা ছোটখাটো ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হতে বাধ্য হয়েছেন। তবুও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তারা নিয়মিত পাঠদান অব্যাহত রেখেছেন।
মাদরাসা সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানে ৩৬৬ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। ২০২৫ সালের দাখিল পরীক্ষায় ২১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৭ জন, ২০২৪ সালে ১৯ জনের মধ্যে ১৩ জন এবং ২০২৩ সালে ২০ জনের মধ্যে ৯ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। ২০২৬ সালে ১৮ জন শিক্ষার্থী দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শিক্ষকরা প্রায় তিন দশক ধরে বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করে প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু দ্রুত এমপিওভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া না হলে যে কোনো সময় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। এতে এলাকার শত শত শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
গাড়ীক্ষেত্র ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসার সভাপতি আনেয়ারুল ইসলাম বলেন,প্রতিষ্ঠার ২৭ বছর পেরিয়ে গেলেও মাদরাসাটি এখনো এমপিওভুক্ত হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতন-ভাতা ছাড়া মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ভবন ও শ্রেণিকক্ষও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দ্রুত এমপিওভুক্তি হলে শিক্ষকরা যেমন স্বস্তি পাবেন, তেমনি শিক্ষার পরিবেশও উন্নত হবে।
মাদরাসার সুপারিনটেনডেন্ট লোকমান হোসেন বলেন,এলাকার ওলামায়ে কেরাম, শিক্ষানুরাগী, দাতা ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় ১৪৬.৫ শতক দানকৃত জমির ওপর প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে। শিক্ষানুরাগী আবদুল আলিম, আবদুল জব্বার মণ্ডল, খয়বর আলী, মকবুল হোসেন, পরিজান বেওয়াসহ ১৭ জন দাতার অবদানে আজকের এই প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়েছে। অনেক কষ্টে শিক্ষার্থী ভর্তি, অবকাঠামো নির্মাণ ও শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিবছর এখান থেকে শিক্ষার্থীরা দাখিল পাস করে উচ্চশিক্ষায় যাচ্ছে। কিন্তু বারবার আবেদন করেও এমপিওভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। দ্রুত এমপিওভুক্তির মাধ্যমে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার ব্যবস্থা এবং প্রতিষ্ঠানটির টিকে থাকার সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার আবদুল লতিফ বলেন,প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে চালু রয়েছে। তারা এমপিওভুক্তির জন্য চেষ্টা করছে। আশা করছি, বিষয়টির ইতিবাচক সমাধান হবে।
মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আকতার জাহান সাথী বলেন,প্রতিষ্ঠানটির বিষয়টি জেনেছি। এমপিওভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় আবেদন ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।
এদিকে এলাকাবাসীর দাবি, গাড়ীক্ষেত্র ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসাকে দ্রুত এমপিওভুক্ত করে শিক্ষক-কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন-ভাতার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক। তাদের ভাষায়, এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বাঁচলে বাঁচবে এলাকার ভবিষ্যৎ।

