অষ্টগ্রাম (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা:
একসময় হাওর ও ভাটী অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ ও দূর-দূরান্তে যাতায়াতের একমাত্র ভরসা ছিল বিশাল আকৃতির দোতলা লঞ্চ। বর্ষার থৈ থৈ জলরাশি কিংবা শুষ্ক মৌসুম সব পরিবেশেই দেশের যেকোনো গন্তব্যে পৌঁছাতে এই লঞ্চগুলোই ছিল একমাত্র বিলাস বহুল ও নিরাপদ বাহন।
কিশোরগঞ্জের ভৈরব বাজার থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ, চাতলপাড় হয়ে হবিগঞ্জের সাচনা ও মার্কুলী পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময় পরপর একের পর এক ভিড়ত এসব সুবিশাল লঞ্চ। ঘাটে ঘাটে যাত্রীদের উৎকণ্ঠা ও ব্যাকুল অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে যখন লঞ্চ এসে পৌঁছাত, তখন পুরো টার্মিনাল যেন প্রাণ ফিরে পেত। যাত্রীদের দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি দূর করতে কেবিন, ডেক, ছোট ক্যাফেটেরিয়া আর নদীর হিমেল হাওয়ার মেলবন্ধন প্রতিটা ভ্রমণকেই করে তুলত পরম আরামদায়ক ও আনন্দময়।
তবে গত কয়েক বছরে ভাটি অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এসেছে অভাবনীয় পরিবর্তন। অল-ওয়েদার সড়ক, দৃষ্টিনন্দন সেতু এবং সাবমার্সিবল রোড সুবাদে হাওরের যাতায়াত এখন অনেক সহজ ও দ্রুতগতির। অটো, সিএনজি, মোটরসাইকেল আর দ্রুতগতির স্পিডবোটের দাপটে যাত্রী সংকটে পড়ে ধীরে ধীরে জৌলুস হারাচ্ছে শতবছরের ঐতিহ্যবাহী এই লঞ্চগুলো। যেসব ঘাট একসময় শত শত মানুষের কোলাহলে মুখরিত থাকত, সেখানে এখন শুধুই সুনসান নীরবতা।
ভৈরব-মার্কুলি লাইনের লঞ্চ মাস্টার আনিসুল ইসলাম জানান, বর্ষাকালে কিছু যাত্রী পাওয়া গেলেও শুষ্ক মৌসুমে লঞ্চের যাত্রী একেবারেই মিলছে না।
ভৈরব লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান হেলিম আক্ষেপ করে বলেন, দিন দিন যাত্রী কমে যাওয়ার পাশাপাশি এখন মালামাল পরিবহনও আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। নিয়মিত যাত্রী না পাওয়া এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নদীপথে লঞ্চ ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে না পেরে অনেক মালিকই ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন।
তিনি আরও জানান ভৈরব-মার্কুলি-অষ্টগ্রাম-মিঠামইন লাইনে বর্তমানে নামকাওয়াস্তে মাত্র ১৫টি লঞ্চ চললেও লোকসানের হাত থেকে বাঁচতে মালিকেরা সেগুলো স্টাফদের কাছে সামান্য টাকায় ভাড়া দিয়ে দিচ্ছেন।
হাওরের একাধিক প্রবীণ বাসিন্দা স্মৃতিচারণ করে বলেন, লঞ্চ ভ্রমণ কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার মাধ্যম ছিল না, এটি ছিল আমাদের হাওরাঞ্চলের লোকসংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। নদীর কলতান, উত্তাল ঢেউ আর লঞ্চের খোলা ডেকে বসে খোশগল্প,তাস খেলা, পত্রিকা পড়া, গান গাওয়ার সেই মুখরিত আড্ডাগুলো আজ কেবলই স্মৃতির পাতায় বন্দী। নতুন প্রজন্মের কাছে এই ধীরগতির রোমাঞ্চকর ও রোমান্টিক ভ্রমণ এখন যেন শুধুই রূপকথার গল্প।
আধুনিক যোগাযোগের ছোঁয়ায় সড়কপথে অগ্রগতির সুবাতাস বইলেও, ভাটি অঞ্চলের শত বছরের ঐতিহ্য, নদীমাতৃক রূপ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের অন্যতম প্রতীক এই দোতলা লঞ্চ সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তির শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।


