মোঃ শাহজালাল, বরগুনা।।
বরগুনার আমতলী উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. জালাল উদ্দিন ফকিরকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অভিযোগ, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও সাংগঠনিক বিরোধের মধ্যেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর সঙ্গে তাঁর সৌজন্য সাক্ষাতের ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সাক্ষাতের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর আমতলী বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে এ নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
জালাল ফকিরের বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি, হামলা, ভাঙচুর, পরিবহন স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণ এবং দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্যের মতো নানা অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। এসব অভিযোগের অনেকগুলোই স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে তোলা হয়েছে। তবে জালাল ফকির সব অভিযোগ অস্বীকার করে এগুলোকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অপপ্রচার হিসেবে দাবি করেছেন।
আমতলী বিএনপির অন্যতম নেতা মো. মশিউর রহমান আকন বলেন, জালাল ফকিরকে ঘিরে অতীতের নানা বিতর্ক ও অভিযোগের বিষয়টি উপেক্ষা করে তাঁকে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে তা দলের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
মশিউর রহমানের অভিযোগ, জালাল ফকিরের দুই ছেলে রাহাত ফকির ও ফরহাদ ফকিরকে ঘিরেও একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এবং তাঁদের কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে বিতর্কিত ব্যক্তিদের জায়গা করে দেওয়া হলে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী হওয়ার পরিবর্তে দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মশিউর রহমান আরও বলেন, দলের নেতাকর্মীদের জন্য একই ধরনের সাংগঠনিক মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন। কারও বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলে তা দলীয়ভাবে যাচাই করতে হবে। অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
জালাল ফকিরকে ঘিরে বিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ২০২৪ সালের আগস্টে। আমতলীর চলাভাঙ্গা এলাকায় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় তাঁকে প্রধান আসামি করে মামলা হওয়ার কথা সামনে আসে। তাঁর ছেলে রাহাত ফকিরসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুর, লুটপাট ও হামলার অভিযোগও ওঠে। একই সময়ে পৌরসভা কার্যালয়, বাড়িঘর ও দোকানে হামলা-ভাঙচুর, জমি দখল ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ তুলে মানববন্ধন ও ঝাড়ু মিছিল করা হয়।
২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও জালাল ফকিরের বিরুদ্ধে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্যের অভিযোগ ওঠে। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলেও তিনি ‘মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে’ একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছিলেন- এমন অভিযোগের পর তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘদিন বহিষ্কৃত থাকার পর গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে তাঁর প্রাথমিক সদস্যপদ পুনর্বহাল করা হয়।
এরপর ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি উপজেলা বিএনপির তৎকালীন সদস্যসচিব তুহিন মৃধা সংবাদ সম্মেলন করে জালাল ফকির ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, জালাল ফকির ও তাঁর সহযোগীরা চাঁদাবাজি, জমি দখল, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও নেতাকর্মীদের হয়রানির সঙ্গে জড়িত। একই সংবাদ সম্মেলনে জালাল ফকিরের দুই ছেলে রাহাত ফকির ও ফরহাদের বিরুদ্ধে বাসস্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবহন থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগও তোলা হয়।
তুহিন মৃধার ওই বক্তব্যের পর জালাল ফকিরকে ঘিরে আমতলী বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ আরও প্রকাশ্য রূপ নেয়। দলীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ একদিকে জালাল ফকিরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত দাবি করে, অন্যদিকে তাঁর অনুসারীরা এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক বিরোধের ফল হিসেবে দাবি করেন।
২০২৬ সালের মে মাসে উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি তারিকুল ইসলাম সোহাগও রাহাত ফকিরের বিরুদ্ধে থ্রি-হুইলার ও সিএনজি স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবহন থেকে টাকা আদায়ের অভিযোগ করেন। প্রতিবাদকারীদের মারধর ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগও করা হয়। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে এবং একটি মামলার তদন্ত চলমান থাকার কথাও জানা গেছে।
তবে জালাল ফকির এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাঁকে হেয় করতে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, বিগত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে যারা বিভিন্ন সুবিধা নিয়েছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁরাই তাঁকে ঘায়েল করতে সক্রিয় হয়েছেন।
নিজের দুই ছেলে রাহাত ও ফরহাদকে নিয়েও ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে জালাল ফকির দাবি করেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে বৈঠকের পর তিনি তাঁদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। তাঁর দাবি, তাঁর ছেলেরা কোনো অন্যায় কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল না এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না।
অন্যদিকে জালাল ফকিরের বিরোধী পক্ষের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও পাল্টা অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা দাবি করছেন, তাঁর বিরুদ্ধে যারা কথা বলছেন, তাঁদের কারও কারও বিরুদ্ধেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত, রাজনৈতিক সুবিধা গ্রহণ ও অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির অভিযোগ রয়েছে। তুহিন মৃধার বিরুদ্ধেও তদন্তসাপেক্ষে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
আমতলী উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব তুহিন মৃধার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
এমন পরিস্থিতিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর সঙ্গে জালাল ফকিরের সৌজন্য সাক্ষাৎ স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি করেছে। জালাল ফকিরের অনুসারীদের কাছে এটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক যোগাযোগ হলেও বিরোধী পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে এ নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের একটি অংশের মতে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে কোনো নেতার সৌজন্য সাক্ষাৎকে সরাসরি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অনুমোদন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের মধ্যে থাকা কোনো নেতার সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্বের সাক্ষাৎ তৃণমূলে রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন বার্তা তৈরি করতে পারে।
আমতলী বিএনপির বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল সংকটটি দাঁড়িয়েছে অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা নিয়ে। জালাল ফকিরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর কোনটি মামলা পর্যায়ে রয়েছে, কোনটির তদন্ত হয়েছে এবং কোনটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য তা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একইভাবে তাঁর বিরোধীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
উপজেলা বিএনপির অন্যতম নেতা মশিউর রহমান আকনের বক্তব্য, দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাব কারও জন্য দায়মুক্তির কারণ হতে পারে না। একই সঙ্গে কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার সুযোগও থাকা উচিত নয়।
এদিকে বিএনপি কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সঙ্গে জালাল উদ্দিন ফকিরের সৌজন্য সাক্ষাৎকে ঘিরে তৃণমূলের আলোচনায় আবারও সামনে এসেছে আমতলী বিএনপির দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ বিভাজন। এক পক্ষ যেখানে জালাল ফকিরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সাংগঠনিক তদন্ত দাবি করছে, অন্য পক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে চলমান অভিযোগকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছে।
দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিরোধের পরিবর্তে দলীয় শৃঙ্খলা, তদন্ত ও জবাবদিহিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা দুই ক্ষেত্রেই একই নীতি অনুসরণ করার দাবি রয়েছে।
আমতলী বিএনপিতে জালাল ফকিরকে ঘিরে চলমান বিরোধ এখন তাই শুধু একজন নেতার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা, দলীয় শৃঙ্খলা, তৃণমূলের আস্থা এবং সাংগঠনিক জবাবদিহির প্রশ্ন। রুহুল কবির রিজভীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসায় আমতলী বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এর প্রভাব কতটা পড়ে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
মোঃ শাহজালাল
বরগুনা।।


